জ্বালানি নিরাপত্তায় কানাডার বিনিয়োগ চান চট্টগ্রাম সিটি মেয়র
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:১৯ | অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কানাডার সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) কানাডার লাসাল—এমার্ড—ভার্দ্যাঁ (LaSalle—Émard—Verdun) আসনের সংসদ সদস্য এবং জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রীর সংসদীয় সচিব (Parliamentary Secretary) ক্লদ গুয়ে (Claude Guay)-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
সাক্ষাতে চট্টগ্রামের জ্বালানি সম্ভাবনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চট্টগ্রামে একটি কানাডিয়ান বিশেষায়িত শক্তি অর্থনৈতিক অঞ্চল (Canadian Specialized Energy Economic Zone) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
কানাডার ফেডারেল সরকারের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি ক্লদ গুয়ে দেশটির জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের নীতি ও উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বৈঠকে শুধু চট্টগ্রামের উন্নয়ন নয়, বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত সমাধান তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
প্রস্তাবিত উদ্যোগের আওতায় চট্টগ্রামে একটি আধুনিক ও বৃহৎ তেল শোধনাগার (Refinery) স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বাড়ানো, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ করার লক্ষ্য রয়েছে।
উদ্যোগটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কানাডা থেকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (Canadian crude oil) সরবরাহের সম্ভাবনাও বৈঠকে উঠে আসে। কানাডার বিশাল জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক সক্ষমতাকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে আলোচনা হয়।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কানাডার মতো জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা গেলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু চট্টগ্রামের জন্য একটি প্রকল্প করা নয়। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে এমন একটি জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করা, যা বাংলাদেশের শিল্প, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।”
মেয়র আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। তাই প্রস্তাবিত উদ্যোগটি শুধু চট্টগ্রামকেন্দ্রিক প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং সমগ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করার পেছনে রয়েছে এর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে ভূমিকা এবং জাতীয় আমদানি-রপ্তানি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত জ্বালানি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ আরও কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে।
প্রস্তাবিত জ্বালানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে (Energy Economic Zone) ভবিষ্যতে রিফাইনারির পাশাপাশি জ্বালানি সংরক্ষণ ও বিতরণ অবকাঠামো, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সেবা এবং অন্যান্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো কানাডার প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের বাজার ও জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তি তৈরি করাও এর উদ্দেশ্য।
বৈঠকে পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ ও কানাডার সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, জ্বালানি কোম্পানি, বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই, বিনিয়োগ কাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিয়ে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও কানাডার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা পেতে পারে।
প্রস্তাবিত Canadian Specialized Energy Economic Zone-এর ধারণাটি বর্তমানে আলোচনা ও প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আরও বিস্তারিত আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটির বাস্তব কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে কানাডার সঙ্গে সম্ভাব্য এই অংশীদারিত্ব নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
ক্যাপশন: কানাডার সংসদ সদস্য এবং জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রীর সংসদীয় সচিব ক্লদ গুয়ে (Claude Guay)-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
