কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হুমকির মুখে জেলেদের জীবন-জীবিকা
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ
শাহজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে একসময় ১৬০ প্রজাতির প্রাকৃতিক দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতিতে। এছাড়া জলমহাল ইজারা ব্যবস্থা স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনুকূলে থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা। আয় কমে যাওয়ায় পৈত্রিক এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন তারা।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার হাওর অধ্যুষিত গ্রাম চং নোয়াগাঁও। একসময় শতাধিক জেলে পরিবারের বসবাস ছিল এখানে। হাওরে মাছ ধরাই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। ভোরে জাল নিয়ে বের হতেন, সন্ধ্যায় ফিরতেন মাছে ভরা নৌকা নিয়ে। তবে এই জেলেপল্লীর আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য এখন আর নেই।
হাওরে আগের মতো মাছ না থাকায় অনেকে পৈত্রিক ভিটাও ছেড়ে চলে গেছেন। কেউ ঢাকার পোশাক কারখানায়, কেউ দিনমজুরের কাজ করছেন, আবার কেউ রিকশা চালাচ্ছেন। কোনোমতে টিকে আছে ২০ থেকে ২৫টি পরিবার। জেলেদের অভিযোগ, শুধু মাছ কমে যাওয়াই নয়, হাওরের জলমহাল ইজারা ব্যবস্থাও তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
চং নোয়াগাঁও গ্রামের জেলে সুধাংশু দাস বলেন, "আগে আমরা একশঁ'য়েরও উপরে পরিবার ছিলাম। এখন আছে ১০ থেকে ২০টি পরিবার। আমরা জেলেরা হাওরের পানিতে মাছ ধরতে পারিনা, যারা ইজারা এনেছে তাদের টাকা দেওয়া লাগে। তাই যারা টাকা দিতে পারে শুধু তারাই মাছ ধরে।"
মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী জেলেপল্লীর বিমল দাস বলেন, "নদী যারা ইজারা আনে তারা টাকা ছাড়া আমাদের জাল ফেলতে দেয়না, টাকা লাগে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ। আমরা গরিব মানুষ এত টাকা জোগাড় করতে না পেরে ইজারা আনতে পারিনা। আমরা ঢাকা গিয়ে মাটিকাটাসহ বিভিন্ন কাজ করে খাই। যারা ইজারা আনে তারা সবাই এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি। অথচ, ইজারা আনার সময় আমাদের জেলে সমিতির নামেই আনে।"
নিকলী উপজেলার দামপাড়া জেলেপল্লীর পরিমল বর্মণ বলেন, "ইজারাদারদের টাকা নিয়ে জাল ফেললে আমাদের পুষায়না। দৈনিক জমা দিতে হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। মাছ পাই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার। এতে করে সংসার চলেনা।"
জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার হাওরাঞ্চলে একই চিত্র জেলে পরিবারগুলোর। এর প্রভাব পড়েছে হাওরপাড়ের ঐতিহ্যবাহী বালিখলা পাইকারি মাছের বাজারেও। কয়েক বছর আগেও প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হলেও এখন লেনদেন হয় ৫০ লাখেরও কম।
বালিখলা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী এনামুল মিয়া বলেন, "আগে যেসকল মাছ পাওয়া যেত তা বিলিনের পথে। চিংড়ি, বাতাই, টাকি এগলো আগে প্রচুর ছিল, এখন নেই বললেই চলে, খুব কম। আগে একটা মাছ দেখতাম রাণী মাছ, এটা এখন আর চোখে দেখিনা। রিং জালের কারনে বিভিন্ন মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।"
এ বাজারের আরেক ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, "বালিখলা বাজারে হাওরের বড় চিংড়ি ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কেজি আসতো প্রতিদিন। এখন ১০০ কেজিও আসেনা। চায়না দুয়ারী জাল এবং কীটনাষকের জন্য আগামীতে হাওরের দেশি মাছ ঔষধ হিসাবেও পাওয়া যাবেনা। যারা মাছ ধরে তারা কোন নিয়ম মানেনা। এ কারনে ধীরে ধীরে দেশীয় মাছ কমে যাচ্ছে। মাছের বিপর্যয় রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপ দরকার।"
হাওরের নদী-নালা, খাল-বিলের ভরাট হওয়া তলদেশ খনন এবং পোনা মাছ নিধন রোধ করা গেলে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা করা সম্ভব। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি জেলেদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, "হাওরের জলাশয়ে মাছের প্রাচুর্যতা ছিল। কিন্তু ভরাট হয়ে যাওয়ার কারনে প্রাচুর্যতা কমে গেছে। জলাশয়গুলো খননের জন্য প্রস্তাব ইতিমধ্যে উর্ধতন কতৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। খাল-বিল নদী সবগুলো। পাশাপাশি জেলেরা যদি সচেতন না হয় তাহলে এ কাজ সফলকাম হবেনা। তাই জেলেদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সচেতনমূলক সভা করার জন্য প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে।"
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, কিশোরগঞ্জের হাওর ও নদ-নদী থেকে প্রতি বছর উৎপাদন হয় ২৯ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন দেশীয় প্রজাতির মাছ। যা স্থানীয় চাহিদার প্রায় অর্ধেক যোগান দিয়ে থাকে।
