কাউখালীতে কাঁঠাল পাতা পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎপৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

পিরোজপুরের কাউখালীতে কাঁঠাল গাছের পাতা সংগ্রহ করতে গিয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টের প্রধান সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. সিরাজুল ইসলাম ফাইজুল হক (৫০) নামের এক ব্যক্তির করুণ মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বেকুটিয়া-বরিশাল সড়কের চৌরাস্তা সংলগ্ন শিয়ালকাঠী গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
গৃহপালিত ছাগলের জন্য কাঁঠাল গাছের পাতা সংগ্রহ করতে গিয়ে বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে মারাত্মক আহত হন ফাইজুল হক। পরে তাকে কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ফাইজুল হক শিয়ালকাঠী গ্রামের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউখালী-ভাণ্ডারিয়া-স্বরূপকাঠি সংযোগকারী পল্লি বিদ্যুতের ৩৩ হাজার ভোল্টের উচ্চচাপের মূল লাইনের ঠিক নিচেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। সেখানে থাকা একটি কাঁঠাল গাছে উঠে পাতা কাটার সময় অসাবধানতাবশত বিদ্যুতের তারের সঙ্গে স্পর্শ লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন ফাইজুল হক।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও গাফিলতির ফল। নিয়ম অনুযায়ী ৩৩ হাজার ভোল্ট লাইনের নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ গাছের ডালপালা ছাঁটাই করার কথা। কিন্তু গাছপালা ছাঁটাইয়ের নামে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার বিল-ভাউচার তোলা হলেও বাস্তবে তা সঠিকভাবে করা হয় না বলে অভিযোগ তাঁদের।
নিহত ফাইজুল হকের স্ত্রী রুমা বলেন, “আমার তিনটি সন্তান রয়েছে এবং শ্বশুর-শাশুড়ি নাই। সন্তানের বাবাকে হারিয়ে আমি এখন কী করব বুঝতে পারছি না। কীভাবে এই সন্তানদের মুখে আহার তুলে দেব, তা আমার জানা নেই। এই গাছগুলো বিদ্যুৎ বিভাগ কেটে ফেললে আমার স্বামীর এমন করুণ মৃত্যু হতো না। আমি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই, যাতে আর কোনো মানুষকে এভাবে জীবন দিতে না হয়।” এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান রনি বলেন, “কাঁঠাল গাছের ডাল কাটার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন এবং কিছুক্ষণ সেখানে গাছের সঙ্গে থাকেন। কয়েক মিনিট পরে গাছ থেকে নিচে মাটিতে পড়ে যান। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত্যু ঘোষণা করেন।”
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সঠিক কারণ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। তা না হলে বিদ্যুতের লাইনের নিচে ও পাশে থাকা গাছগুলো থেকে আবারও এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পল্লি বিদ্যুতের কাউখালী অভিযোগ কেন্দ্রের ইনচার্জ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, “আমরা নিয়মিত গাছ কর্তন করি। তবে কিছু কিছু এলাকায় গাছ কাটতে গেলে গাছের মালিকরা আমাদের কাজে বাধা প্রদান করেন। যে কারণে সব সময় প্রয়োজনীয় গাছ ছাঁটাই করা সম্ভব হয় না।”
দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। গাছ কর্তন করে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পল্লি বিদ্যুতের গাফিলতির বিষয়ে পিরোজপুর পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আলতাফ হোসেন বলেন, “আমরা প্রতি তিন মাস অন্তর গাছ কর্তন করি। তবে অনেক জায়গায় গাছ কাটতে গেলে সাধারণ মানুষ বাধা সৃষ্টি করে, যে কারণে সমস্যায় পড়তে হয়। এই দুর্ঘটনার ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মূল রহস্য জানা যাবে।”
কাউখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার নাহিদ হোসেন শাওন বলেন, “হাসপাতালে আনার আগেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা গেছেন।”
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ফাইজুল হকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
