মাদকের ছোবলে রংপুরে বাড়ছে কিশোর গ্যাং, বাড়ছে অপরাধ
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ
রংপুর ব্যুরো

রংপুর অঞ্চলে দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে মাদকের বিস্তার। মাদকের ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ। এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন রংপুরের বাসিন্দারা।
জানা যায়, বৃহত্তর রংপুরের লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য অবৈধভাবে আসছে। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো হিসেবে কিছু চালান আটক করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ চালান ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। রংপুরের হারাগাছকে মাদকের বড় ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নখদর্পণে থাকা সত্ত্বেও তারা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রংপুর নগরীর বৈরাগীপাড়া, দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া, তাঁতিপাড়া, রবার্টসনগঞ্জ, স্টেশন-কলোনী, বাবুপাড়া, খেরপাড়া, হনুমানতলা, নিউ জুম্মাপাড়ার সুইপার কলোনী, টার্মিনাল, সিও বাজার ও মুলাটোলসহ জেলার গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেদারসে মাদকের কারবার চলছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশ লাইনের পাশেই টাউন হল চত্বর, জুলাই চত্বর এবং ডিবি কার্যালয়ের ১০০ গজের মধ্যে মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়। মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। মাদকের করাল গ্রাসে নষ্ট হচ্ছে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এ পরিস্থিতিতে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। বস্তি এলাকা থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকাগুলোতেও মাদকসেবনের অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, রংপুরে লাইসেন্সের অপব্যবহার করে বৈধ বিক্রয়কেন্দ্রের আড়ালে অবৈধ দেশি মদের রমরমা ব্যবসা চলছে। বরাদ্দের দ্বিগুণ মদ অবৈধ পন্থায় সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মাদক পরিবহনে শিশু-কিশোরদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত মদের পরিমাণ ও ক্রেতার সংখ্যা—কোনোটিই মানছেন না নামধারী বৈধ ব্যবসায়ীরা। ফলে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা যাচ্ছে না এবং বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা।
রংপুর বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুরে তিনটি বৈধ মদ বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হলো রংপুর সদর, বদরগঞ্জ ও কাউনিয়া উপজেলা। এছাড়া কুড়িগ্রামে দুটি, লালমনিরহাটে দুটি, নীলফামারীতে তিনটি, পঞ্চগড়ে একটি ও দিনাজপুরে চারটি বৈধ মদ বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
এসব কেন্দ্রে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি উৎপাদিত দুই ধরনের মদ বিক্রির অনুমতি রয়েছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ লাইসেন্সধারী ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে। তবে নিয়ম না মেনে নির্দিষ্ট পরিমাণের কয়েকগুণ বেশি মদ বিভিন্ন পন্থায় সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লাইসেন্সধারীদের কাছে মদ বিক্রির বাধ্যবাধকতা থাকলেও লাইসেন্স ছাড়াও অবাধে মদ সেবন ও বিক্রি হচ্ছে। এসব বিষয় ওপেন সিক্রেট বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সম্প্রতি রংপুরের কাউনিয়ায় সরকার অনুমোদিত একটি দেশি মদের বিক্রয়কেন্দ্রে মদ বিক্রি ও সেবনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওর সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী একটি শিশুকে মদের পাত্র বহন করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে বসে মদ পান করতে দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে স্থানীয় লোকজন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছেও দেশি মদ বিক্রি করা হচ্ছে।
কাউনিয়া কেন্দ্রের মদ বিক্রেতা রতন সরকার বলেন, ‘আমি লাইসেন্স ছাড়া মদ বিক্রি করি না। ভিডিওতে মদ খাওয়ার বিষয়টি সুইপারদের। পাত্রে করে মদ নিয়ে যাওয়া শিশুটিও সুইপারের ছেলে। সুইপাররা জন্মের পর থেকেই মদ খায়। ওদের বাধা দেওয়া যায় না।’
রংপুর বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন কাউনিয়ায় মদ বিক্রি, সেবন ও শিশু দিয়ে মদ পরিবহনের বিষয়ে বলেন, ‘ভিডিওটি আমাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, আগস্ট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ৬৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে রংপুর রেঞ্জ পুলিশের চলমান অভিযানে আগস্ট মাসে আট জেলায় মোট ৪৯৭টি মাদক মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৬৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানকালে ২২২ দশমিক ৫ কেজি গাঁজা, ১২১ বোতল ফেনসিডিল, ২১ হাজার ৫১৪ পিস ইয়াবা এবং ২৭ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিআইজি বলেন, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
