মৌসুমেও চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় কমেছে ইলিশের বিচরণ

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  শওকত আলী, চাঁদপুর

চাঁদপুর নৌ-সীমানার পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও মাছটির বিচরণ অনেকাংশে কমেছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের আমদানি খুব একটা কমেনি। বরং বড় সাইজের ইলিশ তুলনামূলক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। দাম অবশ্য আগের মতোই চড়া।

বর্তমানে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। স্থানীয় জেলেদের আহরিত ইলিশের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রাম থেকেও কিছু ইলিশ আসছে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। এতে মাছঘাটের কর্মব্যস্ততা কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে স্থানীয় ও আমদানি করা ইলিশ মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মণ মাছ কেনাবেচা হচ্ছে।

সরেজমিনে চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, সদর উপজেলার আনন্দ বাজার, বহরিয়া ও হরিণা ফেরিঘাট এলাকার জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

আনন্দ বাজার এলাকার জেলে জামাল গাজী বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের আমদানি কমেনি। তবে ছোট সাইজের ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে। বড় সাইজের ইলিশই বেশি মিলছে। তাঁর ভাষ্য, গত পাঁচ থেকে সাত বছরের তুলনায় পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের পরিমাণ কমেছে।

লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া জেলেপাড়ার প্রবীণ জেলে জামাল মিয়াজী বলেন, নদীতে জাটকা ও মা ইলিশ প্রজননের সময় কিছু মৌসুমী জেলে জাটকা আহরণ করেন। এতে ইলিশ বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের জাল ব্যবহারও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এসব কারণে আগের তুলনায় ইলিশ কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

হানাচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট সংলগ্ন মাছঘাটের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নদীতে ইলিশ আছে। তবে গত বছরের তুলনায় দাম কমেনি। পদ্মা-মেঘনার টাটকা ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় জেলেরা ঘাটে ইলিশ নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি হয়ে যায়। অনেক ক্রেতাই সরাসরি ঘাট থেকে ইলিশ কিনতে চান।

এই ঘাটের পাইকারি ইলিশ বিক্রেতা মোহাম্মদ ইব্রাহীম জানান, বরফ ছাড়া এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতিকেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা। ছোট সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

কচুয়া থেকে হরিণা মাছঘাটে ইলিশ কিনতে আসা মোহসিন হোসাইন বলেন, তাজা ইলিশ কেনার জন্য তিনি এই ঘাটে আসেন। ছোট ও মাঝারি সাইজের ইলিশ মিলিয়ে ১০ হাজার টাকার মাছ কিনেছেন। বড় সাইজের ইলিশ বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে কেনা কঠিন। তবে এই ঘাটে ডাকে ইলিশ বিক্রি হওয়ায় ক্রেতারা তুলনামূলক ভালো মাছ বেছে নিতে পারেন।

হাজীগঞ্জ শহর থেকে আসা ক্রেতা মাছুম তালুকদার বলেন, ইলিশের আমদানি থাকলেও দাম কমেনি। দরদামে মিললে তিনি মাছ কিনবেন। চাঁদপুরের ঘাটে তাজা ইলিশ পাওয়া যায় বলেই দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে গাড়ি নিয়ে এখানে আসেন।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবে বরাত সরকার বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের আমদানি কমেওনি, বাড়েওনি। অনেকটা স্থিতিশীল রয়েছে। মাঝে মাঝে আমদানি বাড়লেও চাহিদার তুলনায় তা কম। চাঁদপুরের ইলিশ দেশজুড়ে ব্র্যান্ডিং হওয়ায় এখানকার মাছের ক্রেতাও বেশি।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য বিভাগের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে জাটকা রক্ষা ও মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত গড়ে ইলিশের আমদানি ঠিক আছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হলে গত বছরের সঙ্গে উৎপাদনের প্রকৃত পার্থক্য জানা যাবে।

ইলিশ গবেষক (অব.) ড. আনিছুর রহমান বলেন, পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ নির্ণয়ে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জেলেরা ছোট সাইজের ইলিশ ধরতে কারেন্ট জালের মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ জাল ব্যবহার করছেন।

তিনি আরও বলেন, মেঘনার মোহনা ও নদীর তলদেশে পলি জমে বড় বড় চর ও বালুচর সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও মাইগ্রেশন রুট সংকুচিত ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গভীর পানির মাছ হওয়ায় ইলিশ অগভীর ও চরপ্রবণ পথ এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে।

এ ছাড়া নদীর তলদেশে পানি দূষণের কারণে ইলিশের খাদ্য সংকটও তৈরি হয়েছে।