টাঙ্গাইলে বাড়ছে কলার চাষ, ঘুরছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪০ | অনলাইন সংস্করণ
রঞ্জন কৃষ্ণ পণ্ডিত, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে কলার চাষ। কলা চাষকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ ফল। ফলে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ কলা চাষের সম্প্রসারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।
তবে সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ন্যায্যমূল্য ও লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। আগে যেসব পাহাড়ি অঞ্চলের জমি ও চরের পলিমাটি অনাবাদি পড়ে থাকত, সেসব জমিতে এখন অমৃতসাগর, মেহেরসাগর, চাম্পা ও সবরি কলার বাগান গড়ে তুলে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এসব এলাকার কৃষকরা।
কম খরচ ও স্বল্প পরিশ্রমে ভালো ফলন ও মুনাফা পাওয়ায় প্রতিবছরই নতুন নতুন কৃষক কলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এখানকার উৎপাদিত কলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন নদী ও সড়কপথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ১২টি উপজেলাতেই কম-বেশি কলার চাষ হলেও পাহাড়ি এলাকা ও যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের পাহাড়ি অঞ্চল এবং ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল সদর ও কালিহাতীর চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি কলার বাগান।
কলা চাষের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ঘাটাইলের জোড়দিঘী এলাকার চাষি রহমত আলী বলেন, প্রতি ছড়িতে জমির লিজসহ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ পড়ে। বিক্রির সময় সর্বনিম্ন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। তবে ২০০ টাকা খরচ করে ৪০০ টাকায় বিক্রি করলেই পুরো ২০০ টাকা লাভ হিসেবে ধরা যাবে না। কারণ, এক বিঘায় যদি ৩৫০টি কলার গাছ লাগানো হয়, বিক্রির সময় সবগুলো বিক্রি করা সম্ভব হয় না। প্রায় ৫০টি গাছের ক্ষতি ধরেই হিসাব করতে হয়।
কলা চাষি আমিরুল ইসলাম বলেন, “কলা চাষ বেশ লাভজনক। আমি প্রায় ২০ বছর যাবত কলা চাষ করে আসছি। এখনও তিন একর জমিতে আমার বাগান রয়েছে। এ বছর আরও চার একর বাড়াচ্ছি। অনেক বছর ধরে চাষ করছি, এখন পর্যন্ত লাভজনকই মনে হয়েছে। তবে সিগাটোকা রোগের আক্রমণ রয়েছে। এ রোগে পাতাগুলো মরে লাল হয়ে যায়। রোগের আক্রমণ না হলে চাষে ভালো লাভ হয়। প্রতি গাছে প্রায় ২০০ টাকা খরচ পড়ে, আর আমি আমার বাগানের কলা ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি।”
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে মেহেরসাগর, অমৃতসাগর, চাম্পা ও সবরিসহ বিভিন্ন জাতের কলার ব্যাপক চাষ হয়। বিশেষ করে ঢাকার কলার চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায় মধুপুরের মেহেরসাগর কলা।
তিনি বলেন, “কৃষকদের উন্নত ও ভালো জাত সরবরাহের জন্য আমরা কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন সহায়তামূলক প্রকল্প পরিচালনা করছি। এ ছাড়া যেসব জমিতে পানামা বা সিগাটোকা রোগের প্রকোপ দেখা দেয় কিংবা চাষে ক্ষতি হয়, সেখানে কৃষকদের বিকল্প হিসেবে পেঁপে, আখ ও তরমুজ চাষের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কলার চাষ টাঙ্গাইলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। তবে কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং রোগবালাইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য সরকারি তদারকি বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও হিমাগার স্থাপন করা গেলে টাঙ্গাইলে উৎপাদিত কলা স্থানীয় ও জাতীয় চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
