পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, আধুনিকায়ন হলে ঘুরবে দুর্গাপুরের অর্থনীতি

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:০১ | অনলাইন সংস্করণ

  দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোনার দুর্গাপুর। সীমান্তঘেঁষা এ জনপদের পাহাড়, নদী, সাদা মাটির বিস্তীর্ণ প্রান্তর, গারো পাহাড়, ঐতিহ্যবাহী বটতলা—সব মিলিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। বিশেষ করে বিজয়পুরের সাদামাটি, লক্ষীপুরের গারো পাহাড় ও বটতলা এবং সোমেশ্বরী নদীকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিকায়ন ও পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুলতে পারলে বদলে যেতে পারে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র।

শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে বিজয়পুর সাদামাটির কোহিনূর টিলায় পর্যটকদের উৎসবমুখর উপস্থিতি দেখা গেছে।

স্থানীয়দের মতে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা গেলে সারা বছরই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আধুনিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও নানা ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসা।

দুর্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণ বিজয়পুরের সাদামাটি। বিস্তীর্ণ এলাকায় সাদা মাটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য, নীল আকাশ আর সবুজের সমারোহ পর্যটকদের সহজেই মুগ্ধ করে। এর পাশাপাশি লক্ষীপুরের গারো পাহাড় ও বটতলা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে হতে পারে ভিন্ন মাত্রার আকর্ষণ। পাহাড়ি পরিবেশ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য পর্যটকদের জন্য তৈরি করতে পারে অনন্য অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে, দুর্গাপুরের বুক চিরে বয়ে চলা সোমেশ্বরী নদী এ জনপদের সৌন্দর্যকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। স্বচ্ছ পানির জলরাশি, নদীর দুই পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং চিকচিকে সিলিকা বালুর বিস্তীর্ণ চর পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পড়ন্ত বিকেলে ছোট ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পরিবার-পরিজন কিংবা সহপাঠীদের নিয়ে নদীতে ঘোরার সুযোগ তৈরি হলে পর্যটনে যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা।

তীব্র রোদের মধ্যে সোমেশ্বরীর বালুচরে পানির চিকচিকে প্রতিফলন আর দূরের পাহাড়ের নীলাভ আবহ এক ভিন্ন নান্দনিকতা তৈরি করে। বিকেলের মৃদু আলোয় নদী ও পাহাড়ের সম্মিলিত সৌন্দর্য পর্যটকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

দুর্গাপুরে পর্যটনের পরিধি বাড়লে সরাসরি পর্যটন খাতের পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় তরুণদের জন্য ট্যুর গাইড, নৌযান পরিচালনা, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, হোটেল-রিসোর্ট, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

পর্যটকদের চাহিদা বাড়লে স্থানীয় কৃষিপণ্য, পাহাড়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পণ্য এবং হস্তশিল্পের বাজারও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসার পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দুর্গাপুর পৌর সদরের মাউন্টেন হোটেলের মালিক রব ঢালী বলেন, “দুর্গাপুরে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অনেক কিছুই আছে। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বাড়বে। পর্যটক বাড়লে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও চাঙা হবে।”

‘পর্যটন হতে পারে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি’

দুর্গাপুর উপজেলার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি অজয় সাহা বলেন, “পর্যটন শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক খাত। দুর্গাপুরের প্রাকৃতিক ও নৃ-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো দরকার। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।”

‘প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষা করেই পর্যটন গড়তে হবে’

কবি লোকান্ত শাওন বলেন, “দুর্গাপুরের সৌন্দর্য তার প্রকৃতির মধ্যেই। বিজয়পুরের সাদামাটি, গারো পাহাড়, বটতলা ও সোমেশ্বরী নদী—তার প্রতিটি জায়গার রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য ও গল্প। এগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে, তবে প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করে নয়। পর্যটন আর পরিবেশ সংরক্ষণকে সমন্বয় করে পরিকল্পনা করলে দুর্গাপুর দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।”

বারমারী লক্ষীপুর প্রকৃতির পাঠশালার পরিচালক ও প্রকৃতিপ্রেমী নাজমূল তুহিন জানান, “দুর্গাপুরে প্রকৃতির পাঠ নেওয়ার মতো অসংখ্য জায়গা রয়েছে। পাহাড়, নদী, সাদামাটি, বালুচর ও জীববৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে এখানে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের বিশাল সুযোগ রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে এর সুফল সরাসরি স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছাবে।”

নজরদারি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার দাবি

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পর্যটন করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো দুর্গাপুরের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার, পার্কিং, তথ্যকেন্দ্র, পর্যটক নির্দেশিকা ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

সোমেশ্বরী নদীতে নিরাপদ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। তবে নদী ও বালুচরের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা, নৌযানের নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলছেন পরিবেশ সচেতনরা।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শুধু পর্যটক নয়—পরিবহন, আবাসন, খাবার, স্থানীয় পণ্য, বিনোদন ও সেবাখাতের সঙ্গে জড়িত বহু মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি হয়। সে হিসেবে দুর্গাপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর পাহাড়-নদীর মিতালিতে গড়ে ওঠা দুর্গাপুর তাই এখন শুধু ভ্রমণপিপাসু মানুষের আকর্ষণের জায়গা নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ পেলে এটি হয়ে উঠতে পারে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন দুয়ার।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “দুর্গাপুর উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এটি উপরওয়ালার ঐশ্বরিক দান। কেননা সেখানে ঘুরে আসলে মনে প্রকৃতির আলাদা আবহ দোলা দেয়। মনে হয় প্রাকৃতিক প্রকৃতি কাছে টানছে। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির বন্ধনে। তবে উপজেলার পর্যটনমুখী জায়গাগুলো আমরা কীভাবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আনা যায়, সে বিষয়ে বিশদ পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা প্ল্যানমাফিক কাজ করছি।”