খাতা-কলম ছেড়ে জুতা সেলাইয়ে সপ্তম শ্রেণির অর্ঘ্য

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

  সনৎ চক্রবর্ত্তী, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)

যে বয়সে হাতে থাকার কথা খাতা-কলম, চোখে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে ফুটপাতের দোকানে বসে জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করছে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অর্ঘ্য কুমার দাস (কনক)।

মাত্র ১২ বছর বয়সী অর্ঘ্যের জীবনের গল্প যেন দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও দায়িত্বের এক নির্মম বাস্তবচিত্র। অর্ঘ্য ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার জজ একাডেমির সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার বড়। বাবা-মাসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার তাদের।

অর্ঘ্যের বাবা কার্তিক রবি দাস ইলেকট্রনিকসের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শারীরিকভাবে সমস্যায় পড়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর ফলে তিনি অনেকটাই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।

সংসারে আয়-রোজগারের সংকট দেখা দেওয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে অর্ঘ্য। বোয়ালমারী পৌরসদরের বিলাসী ঘরের সামনে ফুটপাতে ছোট একটি দোকানে বসে জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করে সে। সকাল কিংবা বিকেল—সুযোগ পেলেই দোকানে বসে কাজ করে অর্ঘ্য।

একদিকে স্কুলের পড়াশোনা, অন্যদিকে পরিবারের জন্য উপার্জনের চেষ্টা—দুইয়ের ভার যেন ছোট্ট কাঁধে বহন করছে কিশোরটি।

অর্ঘ্য বলে, “বাবা অসুস্থ। সংসারে অনেক কষ্ট। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি দোকানে বসে কাজ করি। আমি পড়াশোনা করে বড় হতে চাই, কিন্তু পরিবারের জন্যও কিছু করতে হয়।”

কথা বলতে বলতে অর্ঘ্যের চোখেমুখে ফুটে ওঠে ক্লান্তি। তার সমবয়সীরা যখন স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, তখন অর্ঘ্যকে দেখা যায় জুতা-স্যান্ডেলের সেলাই নিয়ে ব্যস্ত থাকতে।

অসুস্থ বাবার অসহায়ত্ব

অর্ঘ্যের বাবা কার্তিক রবি দাস বলেন, “শরীরটা ভালো না থাকায় আগের মতো কাজ করতে পারি না। সংসারে অভাব। ছেলেটা পড়াশোনা করে, কিন্তু আমার অসুস্থতার কারণে সে বাধ্য হয়ে দোকানে বসে। ছেলেটাকে আমি পড়াতে চাই।”

তিনি জানান, নিজের অসুস্থতার কারণে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলের লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়ে যায়—এটাই তার বড় চিন্তা।

অর্ঘ্যদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি ঝুপড়ি ঘরের মধ্যেই বাবা-মা ও সন্তানদের বসবাস। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই চলছে পাঁচ সদস্যের সংসার। ঘরের পরিবেশ ও পারিবারিক সংকট স্পষ্ট করে দেয়, কেন ১২ বছরের অর্ঘ্যকে পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের চেষ্টায় নামতে হয়েছে।

অর্ঘ্যের মা বলেন, “ছেলেটা পড়তে চায়। কিন্তু সংসারে অভাব, বাবাও অসুস্থ। ওকে দোকানে বসতে হয়। আমরা চাই, কেউ যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে ছেলেটার পড়াশোনাটা যেন ঠিকভাবে চালাতে পারি।”