রূপপুর পারমাণবিকে সেফটি ভালভের সমস্যা সমাধান, সফল পরীক্ষা
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২৩ | অনলাইন সংস্করণ
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

দেশে চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে সেফটি ভালভের সমস্যার বিষয়টি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে জনসাধারণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ভালভের সমস্যা সমাধানের জন্য রাশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে গত ২২ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে আসে। তাদের ও বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের নিরলস প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভালভের সমস্যার অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনপিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে তিনি জানান, ১৬ মেগাপাসকেল (MPa) উচ্চচাপে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (PORV/POSV)-এর পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি পিওআরভি ভালভের সমস্যা সমাধানের বিষয়টি নিশ্চিত করে আরও জানান, আগের রাত থেকে শুরু হওয়া এই পরীক্ষা প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (MCR) এবং জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ECR)—উভয় স্থান থেকেই পরিচালনা করা হয়।
পরীক্ষায় কন্ট্রোল ভালভগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। ভালভগুলোর কার্যক্রম সন্তোষজনক পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মেইন সেফটি ভালভ (MSV)-এর কার্যক্রম ও প্রতিক্রিয়াও যাচাই করা হয়। এ সময় ভালভের প্রতিক্রিয়া, খোলা ও বন্ধ হওয়ার কার্যক্রম, অ্যালার্ম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
অনুমোদিত পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করে পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষা শুরুর আগে ও চলাকালে যোগাযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বিকিরণ নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা হয় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, PORV পরীক্ষার সফল সমাপ্তিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, রিঅ্যাক্টরের প্রাইমারি সিস্টেমে নিরাপদ চাপ বজায় রাখার সঙ্গে এই ব্যবস্থাটি সরাসরি সম্পৃক্ত।
কমিশনিং কার্যক্রমের পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পরীক্ষা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, অনুমোদন, ব্রিফিং এবং নিরাপত্তা শর্ত নিশ্চিত হওয়ার পরই পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি ঠিক রাখতে গিয়ে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না বলে ড. জায়েদুল দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন।
পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ মেগাপাসকেল চাপে পরীক্ষা খুব শিগগিরই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কমিশনিং দল ধাপে ধাপে এগোচ্ছে এবং প্রতিটি পর্যায় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করার পর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।
এর আগে সেফটি ভালভের ত্রুটিতে রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন অনিশ্চয়তায় পড়ে। রাশিয়ার পরমাণু প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ চালুর লক্ষ্যে ইউনিট-২ থেকে একটি পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (PORV) ইউনিট-১-এ স্থানান্তরের প্রস্তাব দেয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, রূপপুরের সেফটি ভালভে ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে কবে ত্রুটি মেরামত হবে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
এ সময় প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, বিকল্প ভালভ স্থাপন সম্ভব না হলে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পটির বাণিজ্যিকভাবে চালুর সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
রিঅ্যাক্টরের প্রেসারাইজারে থাকা PORV নিয়ে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এ জটিলতা তৈরি হয়। প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এই ভালভটি রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান।
এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে মোট সাতটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ডিসেম্বরের মধ্যে এই জ্বালানি আনার কথা রয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকারী রাশিয়ার রোসাটমের মিডিয়া উইং এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ এই সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। চুক্তি ও প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী, জ্বালানিগুলো একাধিক ফ্লাইটের মাধ্যমে পরিবহন করা হবে।
এনপিসিবিএলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণত জ্বালানিবাহী ফ্লাইট বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশে আসে। এ হিসেবে ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার প্রথম চালান পৌঁছানোর পর বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে শুক্রবার (২ অক্টোবর) এই ইউরেনিয়াম ঢাকা থেকে সড়কপথে ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রকল্প এলাকার দ্বিতীয় ইউনিটে নেওয়া হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির দুটি ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে।
রূপপুর প্রকল্পের মূল নকশাকার ও প্রধান ঠিকাদার হিসেবে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পালন করছে রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ।
রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য কম-কার্বন বিদ্যুতের বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত। তবে সেফটি ভালভের জটিলতার কারণে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এখন PORV-এর সফল পরীক্ষা কমিশনিং কার্যক্রমকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
