রংপুর লায়ন্স ক্লাবে হামলার অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২০ | অনলাইন সংস্করণ
রংপুর ব্যুরো

উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সেবামূলক প্রতিষ্ঠান লায়ন্স ক্লাব রংপুর ও ‘রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ ঘিরে হামলা-ভাঙচুর, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে একটি পক্ষ। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১২ অক্টোবর) পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছে দুই পক্ষ।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় আরকে রোডের হোটেল স্কাই লোন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট লায়ন মনজিল মুরাদ লাবলু, সেক্রেটারি লায়ন আহসানুল হাবীব, ক্লাব পরিচালক লায়ন এনামুল হক সোহেল, লায়ন একেএম বানিউল আদম বাবু, আইপিপি লায়ন নাসরিন হক, ক্লাব পরিচালক শাহিন পারভেজ ও লায়ন মোয়াজ্জেমসহ অন্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে লায়ন এনামুল হক সোহেল ও লায়ন বানিউল আদম বাবু অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠান থেকে অন্যায় সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে একটি পক্ষ প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট, অরাজকতা সৃষ্টি এবং শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ উদ্দেশ্যে কিছুদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তবে এরপরও ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
তাদের অভিযোগ, এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলাকালে কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তিসহ অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জন লাঠি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় নিরাপত্তাকর্মী পলাশ (২৬), আশরাফুল (৪১) ও নিরাপত্তা ইনচার্জ রব্বানী (৪৭) তাদের বাধা দেন।
পরে হামলাকারীরা দেয়াল টপকে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করে বাধা দেওয়া নিরাপত্তাকর্মী ও নিরাপত্তা ইনচার্জকে লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে জখম করেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারীরা তাদের দ্রুত প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে বলেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত লায়ন্স ক্লাবের অফিসকক্ষের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে আনুমানিক এক লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়। এ ছাড়া ক্লাবের কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এলোমেলো করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত ব্যক্তিরা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বলে জানান তারা।
প্রথম পক্ষের নেতারা দাবি করেন, তারাই প্রকৃত লায়ন্স ক্লাবের সদস্য এবং বহিরাগতরা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে। এ ঘটনায় ন্যায়বিচার দাবি করে তারা বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
অন্যদিকে, সোমবার দুপুরে হোটেল ক্যাসপিয়া মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন লায়ন্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট (২০২৬-২৭) লায়ন ফরিদ আহমেদ রুমি, ক্লাব সেক্রেটারি (২০২৬-২৭) লায়ন আকলাকুল ইসলাম তারেক, ক্লাব ট্রেজারার (২০২৬-২৭) লায়ন শফিকুল ইসলাম স্বপন এবং ক্লাব পরিচালক লায়ন নাজমুল আলম নাজু।
সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, ক্লাবে সদস্যপদহীন ও তথাকথিত অবৈধ একটি কমিটি প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে দুর্নীতি ও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, ওই কমিটি ক্লাবের মূল প্রতিষ্ঠাতা, প্রকৃত সদস্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের নানাভাবে হয়রানি করছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত তথ্য গোপন করে নিজেদের স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণ কমিটির আহ্বায়ক এনামুল হক সোহেলের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। এ ছাড়া লায়ন্স ক্লাবের সভাপতি মনজিল মুরাদ লাভলু ও সেক্রেটারি আহসানুল হাবীব মিলনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ক্লাব পরিচালনা, তথ্য গোপন এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার অভিযোগ করেন তারা।
তাদের অভিযোগ, একটি জমি কেনার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি দলিলে জমির মূল্য ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা দেখানো হলেও সরকারি গেইন ট্যাক্স ও আয়কর বাবদ ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা এনামুল হক সোহেল ও তার সহযোগীরা অসদুপায়ে আত্মসাৎ করেন।
এ ছাড়া টেন্ডার ও প্রাক্কলন ছাড়াই নির্মাণকাজ ও লিফট কেনার নামে ২২টি চেকে মোট ৫ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়। তাদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ ও নিয়মকানুন উপেক্ষা করে উন্মুক্ত দরপত্র ও প্রাক্কলন ছাড়াই এসব অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, লিফট কেনার জন্য একটি চেকে ২৩ লাখ টাকা এবং নির্মাণকাজের জন্য ১৮টি চেকে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকা উত্তোলন করা হয়। নির্মাণকাজের অর্থের মধ্যে ভুয়া বিলের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৬২ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, সরকারি ভ্যাট, ট্যাক্স ও ঠিকাদারি লভ্যাংশ আত্মসাৎ, নিরপেক্ষ সিএ ফার্মের অডিট প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণ, লিফট কেনায় দরপত্র জালিয়াতি, এলসি ফাউন্ডেশনের অর্থ আত্মসাৎ, ভবনের নকশা ও অনুমোদনে জালিয়াতি, অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ এবং শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে বাণিজ্যের ঘটনা ঘটেছে।
তারা আরও দাবি করেন, এসব দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় এবং ক্লাব ও স্কুলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছয়জন সাবেক ক্লাব প্রেসিডেন্টসহ মোট ২৯ জন সদস্যকে বেআইনিভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। বোর্ড সভায় দুর্নীতির প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে জিআর ৩৯০/২৪ নম্বর মামলা হয়, যা বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে বলে তারা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন তারা। দাবিগুলো হলো—লায়ন্স ক্লাব অব রংপুর ও রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজকে দুর্নীতিবাজ ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করা; এনামুল হক সোহেল, মনজিল মুরাদ লাভলু ও আহসানুল হাবীব মিলনসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার করা; পাশাপাশি সব অবৈধ নিয়োগ বাতিল করা।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন দ্বিতীয় পক্ষের নেতারা।
