শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সমাজসেবায় দীর্ঘ পথচলা অধ্যক্ষ শহীদ খানের

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

  কলিহাসান, দুর্গাপুর (নেত্রকোনা)

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ঝাঞ্জাইলের অধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ খান, যিনি শহীদ খান নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা, নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষকতার পাশাপাশি নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, মুকাভিনেতা, বক্তা ও সংগঠক হিসেবে তিনি ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার কর্মকাণ্ডের বিস্তার রয়েছে।

শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকতা

শহীদ খানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ১৯৭২ সালে তিনি জারিয়া ঝাঞ্জাইল এন. হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৬ সালে গৌরীপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৮০ সালে সমাজকল্যাণ বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং একই ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া কলেজে সমাজকল্যাণ বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পূর্বধলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা জীবনে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন বলে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ

১৯৭৮ সাল থেকে শহীদ খান বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা, অভিনয় ও গ্রন্থনার সঙ্গে যুক্ত হন। ‘নবকল্লোল’, ‘জন পরিক্রমা’ ও ‘ইউনিভার্সিটি ম্যাগাজিন পরিচয়’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। ১৯৮৮ সালে বিটিভির ‘প্রকৃতি ও প্রত্যয়’ অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

এ ছাড়া জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনায় ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’ গীতিনাট্যে নেপথ্য কণ্ঠ দেন তিনি। বিটিভির ‘নিবেদন’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত ‘রাখালীয়ার বাঁশি’ গীতিনৃত্যনাট্যেও তার কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়। টেলিভিশন ও বেতারে প্রচারিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের বর্ণনাতেও অংশ নেন তিনি।

মুকাভিনয় ও নাট্যচর্চা

১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুকাভিনয়ের মাধ্যমে শহীদ খানের এই শিল্পমাধ্যমে পথচলা শুরু হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ময়মনসিংহ টাউন হল, গৌরীপুর পাবলিক হল, শম্ভুগঞ্জ হাইস্কুল মাঠ, জারিয়া টি অ্যান্ড টি মাঠ এবং ঝাঞ্জাইল ইউনিয়ন পরিষদ মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে মুকাভিনয় পরিবেশন করেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ টাউন হলে যাত্রিক নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় মুকাভিনয় পরিবেশন করে আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান।

নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবেও তার কাজ রয়েছে। সামাজিক অসংগতি, ন্যায়বিচার, গ্রামীণ জীবন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের অধিকার তার নাটকের উল্লেখযোগ্য বিষয়। তার রচিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘ন্যায় ন্যায্য’ (১৯৭৪), ‘চেয়ারম্যান সাবের আপ্যায়ন’ (১৯৭৫), ‘ডাকু মনসুর’ (১৯৭৬), ‘ন্যায়ের পরিণাম’ (১৯৭৭), ‘নিঃস্ব যারা’ (১৯৭৭), ‘অপারেশন কাকনপুর’ (১৯৮০), ‘ফুলবাড়িয়ার বাসযাত্রী’ (১৯৮৫), ‘ফুলবাড়িয়ার ফুলবানু’ (১৯৮৬), ‘খাদ্য বিতরণের ক্যারিকেচার’ (১৯৯২) এবং ‘কোন এক কুদ্দুস’ (১৯৯৫)।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘কোন এক কুদ্দুস’ তার উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্মগুলোর একটি। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ ও ‘মুসলমানীর গল্প’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিনের বাদশা’ এবং ‘প্রত্যয়’সহ বিভিন্ন রচনার নাট্যরূপ ও মঞ্চায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সমাজসেবা

শহীদ খানের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় ১৯৭২ সালে ঝাঞ্জাইলের ‘সন্ধ্যানী’ ও ‘মালঞ্চ’ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ ও ঢাকার বিভিন্ন নাট্যসংগঠনে কাজ করেন তিনি। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে বহুরূপী নাট্য সংস্থা, গৌরীপুর কলেজ নাট্য সংসদ, বহুবচন, নাট্যচক্র, যাত্রিক নাট্যগোষ্ঠী, বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠী ও অক্ষর নাট্য সংস্থা।

১৯৭২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঝাঞ্জাইল মালঞ্চ সংসদের মাধ্যমে স্থানীয় কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন তিনি। সংগঠনটির মাধ্যমে এলাকার হাটবাজার পরিচ্ছন্ন রাখা, চুরি-রাহাজানি প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করার কাজ করা হয় বলে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

ময়মনসিংহের সানকিপাড়ায় রিকশাচালকদের সংগঠিত ও সচেতন করার উদ্যোগেও তার সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। নাট্যচর্চার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা ও সংগঠন গড়ে তোলার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সম্পৃক্ততা

শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও শহীদ খানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার জীবনবৃত্তান্তে। ঝাঞ্জাইল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং ঝাঞ্জাইল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া চেয়ারম্যান বাড়ি জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় জমি দান ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিত্রশিল্প ও সাহিত্যচর্চা

নাটক ও অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রশিল্পেও আগ্রহ রয়েছে শহীদ খানের। ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে একক কার্টুন প্রদর্শনীর আয়োজন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজজীবনে আবৃত্তি, একক অভিনয়, উপস্থিত অভিনয়, উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন করেন।

সাহিত্যের প্রতিও তার আগ্রহ রয়েছে। তার প্রিয় কবিদের মধ্যে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। প্রিয় উপন্যাসের তালিকায় রয়েছে সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’। বাংলাদেশের নাট্যকার মামুনুর রশীদ ও আবদুল্লাহ আল মামুন এবং পশ্চিমবঙ্গের নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তের রচনাও তার পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

শিক্ষকতা, নাট্যচর্চা, মুকাভিনয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনা ও সমাজসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে শহীদ খানের কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে রয়েছে। তার জীবন ও কর্মের তথ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এসব কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নিয়ে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।