দেবহাটায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ২

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  দেবহাটা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

সাতক্ষীরার দেবহাটায় আলোচিত ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় এজাহারনামীয় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মামলাটি দায়ের করেছেন নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের বড় ভাই দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত সামছুর রহমান সানার ছেলে আব্দুল জলিল সানা (৫২)। তার দায়ের করা মামলার নম্বর ০৯, তারিখ ১৫ অক্টোবর। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৮/৪৪৯/৩২৩/৩০২/৩৪/১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মামলার ৫ নম্বর আসামি আসাদুল ইসলাম মোল্যা (৪৬), পিতা রহিম বক্স মোল্যা, সাং নাজিরের ঘের এবং ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩), পিতা মৃত মাহাতাব উদ্দীন খান, সাং সুবর্ণাবাদ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ১ নম্বর আসামি ফজলুল হক আমিনী (৪৫), পিতা কারী রুহুল আমিন, সাং দক্ষিণ পারুলিয়া এবং ২ নম্বর আসামি সাদিকুল ইসলাম ওরফে ভদু (২৮), পিতা শওকত আলী, সাং নিশ্চিন্তপুরসহ এজাহারনামীয় ১০ জন ও অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। গত ১২ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তার স্ত্রী তাকে বলেন, তিনি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন, এর বিচার আল্লাহ করবেন। এরপর দুজনের মধ্যে আরও তর্ক হয়।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, শামীমের ঘরের পাশ থেকে কে বা কারা ওই তর্কের ঘটনা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করেন। পরে আশপাশের লোকজন ও স্থানীয় জামায়াত কার্যালয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের ওই রেকর্ড শোনানো হয়। কথোপকথনে আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে আপত্তিকর কথা রয়েছে বলে এলাকায় প্রচার করা হয়।

এরপর এজাহারনামীয় আসামিরা শামীমের বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়ি ঘেরাও ও ভাঙচুর করেন এবং তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রাণভয়ে শামীম বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে যান। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তাকে কুলিয়ার সবুর ডাক্তারের চেম্বারে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, ১৩ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ১ ও ২ নম্বর আসামি শামীমের অবস্থান জানতে পেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১ নম্বর আসামির নির্দেশ ও নেতৃত্বে অন্য আসামিদের নিয়ে দেবহাটা থানার পশ্চিম কুলিয়া এলাকার আব্দুস সবুর ডাক্তারের চেম্বারের সামনে যান। সেখানে শামীমের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে চিকিৎসকের নিষেধ উপেক্ষা করে তাকে টেনেহিঁচড়ে চেম্বার থেকে রাস্তায় বের করে আনা হয়।

এরপর তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাস্তায় ফেলে বুক, মুখ, মাথা ও পেটে এলোপাতাড়ি লাথি, কিল-ঘুষি মারা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে শামীম অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন। স্থানীয় লোকজন দেবহাটা থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে আসামিরা মিছিল নিয়ে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘেরাও করেন। এ সময় তারা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেন। হাসপাতালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য, শামীমের সঙ্গে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরে এজাহারনামীয় আসামিরা হাসপাতালের মূল ও পেছনের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে শামীমকে বেড থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে বারান্দায় নিয়ে যান। সেখানে তার দুই হাত ও দুই পা ধরে হত্যার উদ্দেশ্যে হাসপাতালের দেয়ালে কয়েকবার আছাড় মারা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় অন্য আসামিরাও তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মারেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

মামলা দায়েরের পর দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীনের নির্দেশনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আল আমিন সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যদের নিয়ে রাতভর অভিযান চালান। এ সময় মামলার ৫ ও ৬ নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আলোচিত এ মামলাটি রেকর্ড করার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।