কক্সবাজারে লাইসেন্সহীন চলছে ৫ শতাধিক হোটেল মোটেল রিসোর্ট

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  এএইচ সেলিম উল্লাহ, কক্সবাজার অফিস

সমুদ্র শহর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার সড়কের দুইপাশে গড়ে দেড়শতাধিক আবাসিক হোটেল-রিসোর্ট। আর শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের ইনানীর পাটুয়ারটেক পর্যন্ত পর্যটকদের বিনোদনের জন্য গড়ে উঠেছে ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়া ‘টুপটুপ রেস্তো এন্ড রিসোর্ট’সহ শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ। কাঠ, বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব রিসোর্ট দেখতে সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব মনে হলেও এদের নেই নিজস্ব কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নেই অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা। নেই ফায়ার লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এমনকি এসব রিসোর্ট নির্মাভে নেয়া হয়নি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদনও। এছাড়াও ব্যবসা পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের ব্যবসা ও বাণিজ্য শাখা থেকেও কোন অনুমোদন নেয়নি একটি রিসোর্ট-কটেজও।

শুধু কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দেড়শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ নয় প্রশাসনিক তদারকির অভাবে অনুমোদনহীন ভাবেই চলছে কক্সবাজার জেলার ৫ শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোঁরা।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও হোটেল মোটেল মালিক সমিতির তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলা শহর, রামুর পেঁচারদ্বীপ ও উখিয়ার ইনানীসহ এবং সীমান্ত জনপদ টেকনাফসহ আশপাশে ৬ শতাধিক হোটেল মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ এবং রেস্তোঁরা রয়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেই দেদারসে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, আমাদের সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায়ই হোটেলের সব ধরণের অনুমোদন রয়েছে। তবে কক্সবাজারের বেশিরভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নাই।

তাঁর মতে, এরা কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। তাই এদের আমরা সমিতির অন্তর্ভুক্ত করিনি।

তবে এদের একটি নিয়মের আওতায় আনা দরকার বলেও মনে করেন আবুল কাশেম। তিনি বলেন, প্রশাসনের উচিৎ এদের একটি নিয়মে এনে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

কিছু লাইসেন্স থাকলেও নবায়ন নেই
এই বিষয়ে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছ থেকে চলতি বছর মাত্র ৫০টি হোটেল লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে আবেদন জমা পড়েছে সর্বাধিক ১০০টি। কিন্তু এর আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এজন্য আমরা অধিকাংশ হোটেলকেই নোটিশ দিয়েছি।

তিনি বলেন, আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। এই কারণে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাতে না পারলেও লাইসেন্স নেয়ার জন্য মালিকদের নোটিশ পাঠাই। তবে এরা যখন ট্রেড লাইসেন্স নেয় তখন যদি ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে কিনা তদারকি করা হতো, সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ স্থাপনা মালিকই ফায়ার লাইসেন্স সংগ্রহ করতেন।

শফিকুল ইসলাম বলেন, নানা সময়ে আমরা বিভিন্ন সভা-বৈঠকে কক্সবাজারের হোটেল মোটেলের অগি নির্বাপন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সচেতন না হলে শতভাগ হোটেল কিংবা স্থাপনা গুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনা সম্ভব নয়।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারি পরিচালক (ডিএডি) সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, কক্সবাজার জেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল মোটেল রিসোর্ট রয়েছে। এর সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তবুও আমরা জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সবাইকে নিরাপত্তার আওতায় আনতে চেষ্টা করি।

তিনি বলেন, এই যে টুপটুপ রিসোর্টে দূর্ঘটনা ঘটলো এই রিসোর্টকে আমরা দুইবার নোটিশ দিয়েছি। কিন্তু তারা সতর্ক হয়নি। অগ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা নেয়নি।

তিনি মনে করেন, আইন প্রয়োগ করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও সচেতন হতে হবে। নতুবা এমন দূর্ঘটনা রোধ করা কখনো সম্ভব হবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ফায়ার লাইসেন্স নয়, কক্সবাজার ও আশপাশের অধিকাংশ হোটেল মোটেল রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোঁরারই সুয়ারেজ ব্যবস্থা নেই। এরা পরিবেশ ছাড়পত্রও নেয়নি।

সুত্র বলছে, কক্সবাজার শহর ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ের জন্য ১৮ থেকে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু কক্সবাজার জেলার অধিকাংশ পর্যটন সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানের এসব অনুমোদন নেই।

এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, জেলার সর্বাধিক ৫০টি হোটেলের পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। এই ছাড়পত্র না থাকার কারণে গেলো এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোঁরা, রিসোর্ট এবং কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ এই কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত ২০ কক্ষের নিচের আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র লাগে না। এছাড়াও ৩০ লাখ টাকার নিচে বিনিয়োগকারি রেস্তোঁরার ক্ষেত্রেও অনুমোদনের দরকার নাই। আর এই সুযোগটিকেই কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে কিছু ব্যবসায়ী।

এদিকে জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, কক্সবাজারের দুই শতাধিক হোটেল মোটেল রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। তার মধ্যে ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠানের সব কাগজপত্র থাকায় তাদের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাকিদের প্রয়োজনীয় কাগজ জমাদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নাগরিক সমাজের প্রশ্ন- ‘এর আগে এরা কোথায় থাকে’?
কক্সবাজারের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিএনপি নেতা রাশেদ মোহাম্মদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, একটি দূর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসন কেবল নড়েচড়ে বসে। তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তিনি প্রশ্ন তুলেন, এর আগে এরা কোথায় থাকে?

রাশেদ বলেন, এদের কাছে (প্রশাসন) তো কক্সবাজার জেলায় কতগুলো আবাসিক হোটেল মোটেল রিসোর্ট ও কটেজ আছে তার হিসাবও নাই। অথচ পর্যটন সেল, বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিসহ কত হাবিজাবি কমিটি রয়েছে। এই সেলের কাজ কি?!

তিনি বলেন, সরকারের উচিৎ প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত করা। কিভাবে অনুমোদন ছাড়া, ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া এতগুলো প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন কক্সবাজারে ব্যবসা করছে- তা তদন্ত করে দেখা উচিৎ।

অপরদিকে কক্সবাজারে অধিকাংশ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির সুপারিশ মতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। তারপর যে পদক্ষেপের নির্দেশনা আসবে তা বাস্তবায়ন করা হবে।