রংপুরে হিমাগারে রাখা আলুতে কৃষকের লোকসান ২ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

রংপুর অঞ্চলে এবার হিমাগারে সংরক্ষিত আলুতে কৃষকের লোকসান হবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। সরকারিভাবে আলুর ক্রয়মূল্য কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। আলুর ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ২০ থেকে ২২ টাকা। হিমাগারে সংরক্ষণের জন্য প্রতি কেজি আলুতে আরও ৭ টাকা খরচ যোগ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায়। এতে চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগে শুধু হিমাগারে সংরক্ষিত আলুতে কৃষকদের লোকসান প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা হবে।

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে আলুর উৎপাদন হয়েছে ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন। বিক্রির পরও বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন আলু মজুত করা হয়। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসেও হিমাগারগুলোতে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৩ টন আলু মজুত রয়েছে।

আলুর ন্যায্য দাম না পেয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। তারা বলেন, ‘আলু আবাদ করি এবার কবরোত যাওয়ার সময় ঘনি আলচে। আলুর পেছনোত তবিল বাট্টা হামার সউগ শ্যাষ। এ্যালা ঋণদফা থাকি আযার হমো কি দিয়ে সেই চিন্তাত নিন না ধরে। হামার পাকে দেকার কাইয়ো নাই। কোনটে পাবো পুঁজি, হাউশ মিটি গেইচে আলু আবাদের।’

কৃষকদের লোকসানের কথা বিবেচনা করে গত ২৭ আগস্ট সরকারিভাবে হিমাগার থেকে আলুর দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নেই। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলছে, ক্রেতাসংকটের কারণে সরকারি নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষকদের পাশাপাশি হিমাগার মালিকরাও ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন। রংপুর কৃষান হিমাগারের ব্যবস্থাপক মাজেদুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে হিমাগার থেকে আলু খালাস না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আলু খালাস না হলে কৃষকদের পাশাপাশি হিমাগারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, হিমাগারের ভাড়া বেশি হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করেও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না। ভাড়া কমানোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করলেও হিমাগার মালিকরা তা মানছেন না। তারা কেজিপ্রতি ৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। এতে কৃষকদের লোকসান কিছুটা হলেও কমবে।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, আলুর দাম ১৩ টাকায় নেমে যাওয়ায় হিমাগার থেকে আলু বের হওয়ার গতি কমেছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ টাকা হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় তারা হিমাগার থেকে আলু তুলছেন না। গত বছরও দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকে তোলা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, কৃষক আলু না তুললে হিমাগার মালিকরা ভাড়া পাবেন না। অন্যদিকে, আলুর পচন ঠেকাতে যন্ত্র চালু রাখায় পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে কিছু আলু কিনে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বাম্পার ফলনেও কৃষকদের লোকসান ঠেকাতে পরিকল্পিতভাবে আলু চাষের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দেশীয় আলুর চাহিদা তৈরিতে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আলুর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি বাড়ানো গেলে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।