রংপুরে বৃষ্টির অপেক্ষায় আমন চাষিরা, সেচে বাড়ছে খরচ

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

তীব্র দাবদাহ ও দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাবে আমন ধান চাষ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। রংপুরের পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রোপা আমনের জমিতে দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। বৃষ্টির অভাবে জমিতে সেচ দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা।

শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, আমন ধানের মৌসুমে নিয়মিত বৃষ্টির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয় কৃষকদের। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমির আর্দ্রতা কমে গেছে। তীব্র রোদ ও গরমে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ায় ধানগাছ সতেজ রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় অনেক কৃষক সেচের মাধ্যমে জমিতে পানি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে বাড়তি সেচের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

পীরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় রোপা আমনের জমিতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও জমির মাটি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পীরগঞ্জ উপজেলায় ২৫ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। তবে বৃষ্টির ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কৃষক সফু মিয়া বলেন, ধানের জমিতে পানি নেই। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। দ্রুত বৃষ্টি না হলে ফলন নিয়ে বিপদে পড়তে হবে। এ সময় জমিতে পানি না থাকলে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হবে।

রায়পুরের কৃষক মজনু মিয়া বলেন, জমির মাটি ফেটে গেছে। ধানগাছের বৃদ্ধি আগের মতো নেই। এখন বৃষ্টি ছাড়া উপায় দেখছেন না তারা। আমন ধান তাদের সারা বছরের খাদ্য ও আয়ের অন্যতম ভরসা। তাই দ্রুত বৃষ্টিপাত প্রয়োজন।

কুমেদপুর ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের কৃষক রিপন মিয়া বলেন, এ সময় আমন ধানের জমিতে প্রচুর পানির প্রয়োজন। ধানগাছে শিষ বের হওয়ার সময় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে।

রায়পুর ইউনিয়নের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, সাধারণত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করেই তারা আমন ধানের চাষ করেন। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টি না হলে জমিতে পানির সংকট দেখা দেয়। তখন বিকল্প উপায়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। এতে বাড়তি টাকা খরচের পাশাপাশি সময় ও শ্রমও বেশি লাগে।

মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ও ইমাদপুর ইউনিয়নের কৃষক আবু বক্কর মিয়া, আব্দুস সাত্তারের ছেলে হিমেল ও আমরুল মিয়া জানান, পানির অভাবে আমন ধানের জমিতে চার থেকে পাঁচবার সেচ দিতে হচ্ছে। পানির সংকটের পাশাপাশি পোকার আক্রমণও দেখা দিয়েছে। সারসংকটের কারণে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে।

মিঠাপুকুরের হরিপুর এলাকার গেল হোসেন জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। ইতোমধ্যে চারবার সেচের পানি দিতে হয়েছে। জমিতে কীটনাশকও স্প্রে করেছেন। তার আশঙ্কা, চলতি বছর আমন ধান চাষে উৎপাদন খরচই উঠবে না।

পীরগঞ্জ পৌরসভার কৃষক রানু মিয়া বলেন, আমন ধানের জমিতে ধানগাছে শিষ বের হওয়ার সময় হওয়ায় পানির প্রয়োজন আরও বেড়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জমিতে পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে গেলে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়। কৃষকেরা অনেক আশা নিয়ে ধান চাষ করেন। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে সেই আশা পূরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।

পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে এবং জমির আর্দ্রতা ধরে রাখতে হবে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দিনে বৃষ্টিপাত হলে ধানের ক্ষতি অনেকটাই কমে আসবে।