পোকা দমনে পাখিই ভরসা, রংপুরে বাড়ছে পার্চিং পদ্ধতি
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৩২ | অনলাইন সংস্করণ
রংপুর ব্যুরো

রংপুর অঞ্চলে রোপা আমন ধানক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন করছেন কৃষকরা। এতে একদিকে যেমন কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা পাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার রংপুর জেলায় এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানের ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এ চাল দিয়ে অন্য জেলার চাহিদাও মেটানো সম্ভব হবে।
চলতি বছর রংপুর জেলায় এক লাখ ৪৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মোট রোপা আমন আবাদি জমির প্রায় ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লাইভ পার্চিং বা ধইঞ্চা গাছের মাধ্যমে এবং এক লাখ ৩১ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে ডেড পার্চিং বা গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি ও বাঁশের বাতা ব্যবহার করে পাখি বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পার্চিং পদ্ধতিতে ধানক্ষেতের আইলে বা জমির মধ্যে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি স্থাপন করা হয়। এসবের ওপর পোকাখেকো পাখি বসে ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। ফলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই ফসলের ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার কৃষকরা মূলত দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন—ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। ডেড পার্চিংয়ে জমিতে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি বা খুঁটি পুঁতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে লাইভ পার্চিংয়ে জমিতে ধইঞ্চা বা অন্য জীবন্ত গাছ লাগিয়ে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের রোপা আমন ধানের ক্ষেত সবুজে ছেয়ে গেছে। কোথাও ধানে শিষ বের হয়েছে, আবার কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে। দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের মাঠের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি। এসব পার্চিংয়ের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি ও দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে।
কৃষকরা জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকছে। পাখির বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক সার হিসেবে যোগ হয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সহায়তা করছে।
কাউনিয়া উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের কৃষক নাছির উদ্দিন বলেন, “পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কম। তাই আমরা কীটনাশকের পরিবর্তে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছি।”
গদাই গ্রামের ধানচাষি শাহজাহান মন্ডল বলেন, “এবার আমাদের জমির ধান বেশ সবুজ ও সতেজ হয়েছে। পুরো ক্ষেতেই পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। আর কিছুদিন পরই আশা করছি সোনালি ধান ঘরে তুলতে পারব।”
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্চিং পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অনেক কৃষক আমন ধানক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার না করে পোকা দমনে সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব এ পদ্ধতি গ্রহণ করছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, আমন ধানের প্রধান ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা ও লেদা পোকার মথ। পার্চিংয়ের ওপর বসা পাখিরা এসব পোকার মথ ও কীড়া ধরে খেয়ে ফেলে। ফলে পোকামাকড়ের বংশবিস্তার প্রাকৃতিকভাবেই কমে আসে।
কাউনিয়া উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, উপজেলার রাজিব ব্লকের কৃষক মফিজুল ইসলাম ও নিজদর্পা গ্রামের আছর উদ্দিনসহ অনেক কৃষক পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকরা এ প্রাকৃতিক ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন।
রংপুর সদর উপজেলার উত্তর খলেয়া পণ্ডিতপাড়ার কৃষক রতন চন্দ্র জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। জমিতে লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করায় পোকা দমন সহজ হয়েছে। এতে খরচ কমার পাশাপাশি ধানের ফলনও ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. লোকমান হাকিম জানান, এ উপজেলায় বিশেষ করে নিচু জমিতে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি ও বাঁশের বাতা ব্যবহার করে পার্চিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। পায়রাবন্দ গ্রামের কৃষক আব্দুস সবুরও এক একর জমিতে এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এসব পার্চিংয়ে বসে পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
সোমবার রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম জানান, কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলায় পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কীটনাশক বা বালাইনাশক কেনার খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি রোপা আমনের ফলনও ভালো হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী এ পদ্ধতির ব্যবহার দিন দিন বাড়বে। এতে কৃষকরা উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও সহজ হবে।
