ইনানীতে শতাধিক হোটেল অবৈধ? একটি ভবনে ‘রহস্যময়’ ভাঙচুর

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ২২:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

  এএইচ সেলিম উল্লাহ, কক্সবাজার

কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন, নির্মাণবিধি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাইয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তৎপরতার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের একাংশের মধ্যে এ উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের প্রশ্ন, পর্যটন অবকাঠামোর অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে নেওয়া হচ্ছে, নাকি এর ফলে বৈধ বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ছে?

ইনানীতে বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিক শহীদুল হকের দাবি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণের অনুমতি নিয়েই তারা হোটেল নির্মাণ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণে প্রায় ছয় কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর কউকের পক্ষ থেকে ভবনটিকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা না করার বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

মালিকপক্ষের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই সোমবার সকালে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা নির্মাণাধীন হোটেলটিতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে, কউকের নোটিশে ভবনটির নির্মাণ অনুমোদন না নেওয়া, নির্মাণকাজ শুরুর সময় নিয়ে অসংগতি এবং সরেজমিন পরিদর্শনে কাঠামোগত ত্রুটি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভবনটির নিরাপত্তা যাচাইয়ে কারিগরি ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিও চেয়েছে সংস্থাটি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?

অনুমোদন নিয়েই ভবন নির্মাণের দাবি

বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিক শহীদুল হক কউকের চেয়ারম্যানের কাছে ২৬ অক্টোবর দেওয়া লিখিত জবাবে জানান, সংশ্লিষ্ট জমির মূল মালিক ছিলেন জাকির হোসেন। ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে কহিনুর শওকত জমিটির মালিকানা লাভ করেন। পরে তার নামে পৃথক নামজারি খতিয়ানও সৃজন করা হয়।

মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ১ নম্বর জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের নকশা অনুমোদন করে। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। ওই অনুমোদনের ভিত্তিতেই ভবন নির্মাণ শুরু করা হয় বলে দাবি তার।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট নিবন্ধিত ১৫৩২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে কহিনুর শওকত ভবন ও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি শহীদুল হকের কাছে বিক্রি করেন। এরপর তার নামে নামজারি করা হয় এবং নিয়মিত উন্নয়ন কর পরিশোধ করে আসছেন বলে জবাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শহীদুল হক আরও জানান, কউকের নির্দেশে অনুমোদিত নকশা দাখিল করা হয়েছিল। নকশার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কউক জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের কাছে তথ্য চাইলে পরিষদ ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি লিখিতভাবে নকশার সত্যতা নিশ্চিত করে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনাপত্তি সনদ নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তবে ইউনিয়ন পরিষদের নকশা অনুমোদন ও পরিবেশগত অনাপত্তি সনদ থাকলেই কউকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা জাতীয় ভবন নির্মাণবিধি (বিএনবিসি) অনুসরণের সব শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কারিগরি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

কউকের নোটিশে যা বলা হয়েছে

কউকের ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের কারণ দর্শানোর নোটিশে ইনানীর রয়েল টিউলিপের পাশের ওই বহুতল ভবনের নির্মাণ অনুমোদন ও নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। এতে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর নকশা প্রদর্শনের নোটিশ, ১৯ নভেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

নোটিশে বলা হয়, ভবনটির নির্মাণকাজ ২০১৮ সালের আগে শুরু হয়নি বলে সরেজমিন তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। এ কারণে বিএনবিসি ২০২০-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী কউকের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট কউকের সদস্য (প্রকৌশল)-এর নেতৃত্বে একটি দল ভবনটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে ভবনের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান কাঠামোগত ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অন্যান্য অসংগতি পাওয়া গেছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। এসব কারণে ভবনটির স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ।

ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না কেন, সে বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কারিগরি ব্যাখ্যা, কাঠামোগত বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, প্রত্যয়নপত্র এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, নোটিশে ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হলেও মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি এর জবাবে অনুমোদনসংক্রান্ত নথি ও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

পুরোনো অনুমোদন বনাম নতুন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার

শহীদুল হকের যুক্তি, ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকা কউকের আওতাভুক্ত ছিল না। সে সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ থেকেই নকশা অনুমোদন ও নির্মাণের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিন পর ওই অনুমোদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার উদ্যোগ আইনগতভাবে কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছেন।

তবে কউকের নোটিশে স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবরের একটি চিঠির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও ব্যবহার সনদ প্রদান বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে নোটিশে দাবি করা হয়।

এখানে মূল প্রশ্ন দুটি—নির্মাণকাজ শুরুর সময় প্রকৃতপক্ষে কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল এবং পরবর্তী সময়ে প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ভবনটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন, অনুমোদনপত্র, নির্মাণের প্রকৃত সময়কাল ও কারিগরি প্রতিবেদন পর্যালোচনা জরুরি।

অনিয়ম থাকলে সমাধান চান বিনিয়োগকারীরাও

মেরিন ড্রাইভ এলাকায় হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণে অনিয়ম বা অসংগতি নেই—এমন দাবি করছেন না পর্যটন খাতের বিনিয়োগকারীদের সবাই। তাদের বক্তব্য, কোনো ভবনে অনুমোদনসংক্রান্ত ঘাটতি, নকশার বিচ্যুতি কিংবা নিরাপত্তার সমস্যা থাকলে তা অবশ্যই আইন অনুযায়ী সমাধান করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ, কারিগরি মূল্যায়ন এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের দাবি, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের মধ্যেই নির্মিত হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য। ফলে এখন একযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রতিটি স্থাপনার অনুমোদন, নির্মাণের সময়কাল ও নিরাপত্তার অবস্থা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, কোনো ভবনে ঝুঁকি থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আবার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে বিনিয়োগ করা কোনো প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ যাচাই ছাড়াই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলাও কাম্য নয়। নিয়মের ব্যত্যয় থাকলে তা সংশোধনের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

টুপটুপ রিসোর্টের দুর্ঘটনার পর তৎপরতা

সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনার পর পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, জরুরি নির্গমনপথ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত শর্ত কঠোরভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

তবে একটি দুর্ঘটনার পর সব স্থাপনার বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকির মাত্রা, আইনগত অবস্থান ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পৃথকভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীদের একাংশ।

তাদের আশঙ্কা, পর্যটন খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা এবং পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুনানির আগে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ

বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিকপক্ষের অভিযোগ, কউকের কাছে অভিযোগ জানানো এবং শুনানির প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ২৬ অক্টোবর ভবনটির বিরুদ্ধে ভাঙচুর বা অপসারণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকার কথা থাকলে তার আগে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তবে শুনানির তারিখ, সেদিন কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কোনো লিখিত আদেশের ভিত্তিতে তা করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ দর্শানোর নোটিশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ভবন ভাঙার নির্দেশ এক বিষয় নয়; প্রতিটির আইনগত ভিত্তিও পৃথক।

এ ঘটনায় কউকের অথরাইজড কর্মকর্তা ফজলে রব্বানীর বিরুদ্ধে একটি পক্ষের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা

পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের টেকসই উন্নয়নে নিরাপদ অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। অননুমোদিত নির্মাণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদনপ্রাপ্ত স্থাপনার নথি যাচাই, ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিক শহীদুল হক তার লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, ভবনটি মাস্টারপ্ল্যানের মৌলিক লক্ষ্যের পরিপন্থী প্রমাণিত হলে কউকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে তিনি প্রস্তুত। একই সঙ্গে ভবনটির কাঠামোগত অবস্থা নিরপেক্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমে পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এখন দেখার বিষয়, কউক মালিকের দাখিল করা নথি ও ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের নিষ্পত্তি কীভাবে করে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখাও কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।