ইনানীতে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আগুন জ্বলতে পারে আরও ৭ দিন

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

  উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে নির্গত গ্যাসে লাগা আগুন আরও অন্তত সাত দিন জ্বলতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা। গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোরপূর্বক আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা অন্য স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই গ্যাসের প্রবাহ ও চাপ কমিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশল নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ইনানীতে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনার পাশে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় এ আগুনের সূত্রপাত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিন ধরে সেখানে নলকূপ খননের কাজ চলছিল। প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে খননের একপর্যায়ে ভূগর্ভ থেকে প্রচণ্ড বেগে গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। পরে গ্যাসে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।

খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন।

আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট, সেনাবাহিনীর ফায়ার টিম ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করলেও তা নেভানো সম্ভব হয়নি। পানি ও বালু ব্যবহারসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। বরং আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকে। পরে মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার পর সেনাবাহিনীর ফায়ার টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। প্রায় ১২ ঘণ্টা চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে আশপাশের লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মঙ্গলবার রাতে ঢাকা থেকে বাপেক্সের দুই সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এস এম নাফিফুন আরহামের নেতৃত্বে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের তীব্রতা বেশি থাকায় আপাতত জোরপূর্বক আগুন নেভানোর চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা অন্য স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই গ্যাসের প্রবাহ ও চাপ কমিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশল নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ ও কার্যকর ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে বলেও জানান বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি ইউএনও পান্না আক্তারের নেতৃত্বে নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় এনে বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়। বাপেক্সের দুই সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বুধবারও (২৮ অক্টোবর) তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন। জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাপেক্সের প্রতিনিধিদল আগুন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করবে।

নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ২০০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে জনসাধারণকে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ইউএনও পান্না আক্তার এ নির্দেশনা জারি করেন। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় সামলাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন জ্বলে ওঠার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, একটি বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় গ্যাসে আগুন জ্বলে ওঠার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ শুরু করে। বিকেল পর্যন্ত পানি, বালুসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে তাদের নির্দেশনায় আগুন নেভানোর চেষ্টা বন্ধ করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, প্রায় ১২ ঘণ্টা চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আশপাশের লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের একটি দল রাখা হয়েছে।

জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামশুল আলম বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। ওই এলাকায় মাটির নিচে গ্যাসের কোনো পাইপলাইন নেই। তার ধারণা, এটি প্রাকৃতিক গ্যাস। আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে, আগুনের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইনানী থেকে মনখালী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় আট হাজারের মতো পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।

উখিয়া পল্লী বিদ্যুতের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কাইজার নুর বলেন, ভূগর্ভ থেকে নির্গত গ্যাসের আগুন বিদ্যুতের খুঁটির তারে লেগে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় ইনানী থেকে মনখালী পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইনের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।