দুর্গাপুরে ৩০০ নারীকে বিনা মূল্যে সেলাই শেখাচ্ছেন জিন্নাত রেহানা

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২৯ | অনলাইন সংস্করণ

  দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি

নিজে সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই গত ১০ বছর ধরে বিনা মূল্যে নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন জিন্নাত রেহানা বিউটি। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে রয়েছেন প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী নারীরাও। তার হাতের সুঁই-সুতার কাজে বদলে গেছে অসংখ্য নারীর জীবন। কেউ শিখেছেন পোশাক তৈরি, কেউবা নকশিকাঁথা সেলাই। এসব কাজ শিখে অনেক নারী নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে দুর্গাপুর সাংবাদিক ফোরামের গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে দীর্ঘদিন ধরে নারীদের জন্য কাজ করে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের কথা তুলে ধরেন জিন্নাত রেহানা বিউটি।

তিনি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার দক্ষিণ ভবানীপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা তারা মিয়ার মেয়ে। বর্তমানে দুর্গাপুর পৌরসভার বাগিচাপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সেলাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত জিন্নাত রেহানা। নিজের কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এক দশক আগে বিনা মূল্যে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। তার লক্ষ্য—নারীরা যেন অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেরাই কাজ শিখে আয় করতে পারেন এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতায় ভূমিকা রাখতে পারেন।

সেলাইয়ের কাজের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে বিরিশিরি থেকে চৈতাটি সড়ক পর্যন্ত ২০০টি তালের বীজ রোপণ করেন তিনি।

নিজ উদ্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ নারীকে বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন জিন্নাত রেহানা বিউটি। পাশাপাশি ৬০ থেকে ৭০ জন নারীকে শিখিয়েছেন হাতের সুঁই-সুতার সূক্ষ্ম কাজ। নকশিকাঁথা সেলাইয়েও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন অসংখ্য নারীকে। তার এই উদ্যোগে নারীরা ঘরে বসেই কাজ শেখার এবং নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পেয়েছেন।

জিন্নাত রেহানা বিউটি বিভিন্ন ধরনের পোশাকে নকশার কাজ করেন। পাঞ্জাবি, কুর্তি, সালোয়ার-কামিজ, ব্লাউজ, শাড়ি, গাউন ও কুটিসহ নানা পোশাকে হাতের কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন নিজের সৃজনশীলতা। বিশেষ করে নকশিকাঁথা সেলাইয়ে তার আগ্রহ ও দক্ষতা রয়েছে। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন তিনি নিজের জীবিকা নির্বাহ করছেন, অন্যদিকে নারীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানোর সুযোগও তৈরি করছেন।

তার এই মানবিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন একমাত্র মেয়ে কামরুন্নাহার মুন্নি। পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নারীদের দক্ষ করে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জিন্নাত রেহানা। নিজের কাজ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, নকশিকাঁথাসহ হাতে তৈরি পণ্যের ছবি এবং কাজের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরতে তার রয়েছে ‘রঙ্গালয়’ নামের একটি ফেসবুক পেজ।

তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ, কাজের পরিধি বাড়ানো এবং আরও বেশি নারীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

জিন্নাত রেহানা বিউটি তার এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। বিশেষ করে নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।

তার প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করা সম্ভব হবে। এতে দুর্গাপুরের আরও অনেক অসচ্ছল নারী সেলাই ও হস্তশিল্পের কাজ শিখে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।

জিন্নাত রেহানা বিউটির এই উদ্যোগ কেবল সেলাই শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন এবং পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার একটি প্রচেষ্টা। যথাযথ সহযোগিতা পেলে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা তৈরির একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজের শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে শত শত নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন জিন্নাত রেহানা বিউটি। তার এই উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে এবং আরও বেশি নারীর কাছে প্রশিক্ষণের সুযোগ পৌঁছে দিতে প্রয়োজন সম্মিলিত সহযোগিতা।