টাঙ্গাইলে দেশি মাছের আকাল, হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

  টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

কোথায় সেই পলো বাওয়া, কোথায় ঝাঁকি জাল—শুকিয়ে গেছে নদী-নালা, বদলে গেছে কাল। একসময় কার্তিক মাসের হালকা শীত আর প্রখর রোদে নদ-নদী, খাল-বিল ও নিচু জমির পানি কমে গেলে দল বেঁধে মাছ ধরতে নামত গ্রামবাংলার কিশোর-যুবকরা। কাদা পানিতে মাছ ধরার সেই উৎসব এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের জলকেলি, বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ, আর তার সঙ্গে হারাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য।

টাঙ্গাইলে কৃত্রিমভাবে পুকুরে মাছ চাষে সাফল্য এলেও প্রাকৃতিক উৎস নদী-নালা, খাল-বিল ও মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় মাছের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও সহজলভ্যতা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি সংকোচন, কৃষিজমিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে টাঙ্গাইল জেলায় দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। মুক্ত জলাশয়ে দেশি মাছের আকাল তৈরি হওয়ায় জেলার ঐতিহ্যবাহী মৎস্য অভয়াশ্রমগুলোও অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্তিক মাসের হালকা শীত আর প্রখর রোদে নদ-নদী, খাল-নালা ও নিচু জমির পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকে। ডোবা, নালা, খাল-বিলের পানি কমে গেলে এসব নিচু স্থানে আটকা পড়ে নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। তখন কাদা পানিতে নেমে হাত দিয়ে মাছ শিকার করা ছিল গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্য। তবে সময়ের পরিবর্তনে দল বেঁধে কিশোর-কিশোরীদের মাছ ধরার সেই দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, কালিহাতী উপজেলার রৌহা গ্রামের শুকনি বিলের এক কোণে ছোট একটি অংশের পানি সেচে মাছ ধরছে চার কিশোর। তারা হলো—রিফাত, মাসফিকুর রহমান, মফিরুল ইসলাম ও সেলিম মিয়া। সারা শরীরে কাদা মেখে আনন্দের সঙ্গে মাছ ধরায় ব্যস্ত তারা।

তারা জানায়, সকাল ৯টার দিকে বিলের ছোট অংশে পানি সেচ শুরু করে বেলা ১২টার দিকে শেষ করে। এরপর কাদা থেকে পুঁটি, চাটা, টাকি, শিং ও বাইমসহ প্রায় ১০ কেজি মাছ ধরে তারা ভীষণ খুশি হয়।

অন্যদিকে, সম্প্রতি ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের চাপড়া বিলেও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে রবিন নামে এক কিশোর তার সঙ্গীদের নিয়ে শোল, টাকি, পুঁটি, খলশে, কৈ, মাগুর, শিং ও ট্যাংরাসহ দেশীয় প্রজাতির নানা মাছ ধরে উল্লাসে মেতে ওঠে। শৈশবের এই অনাবিল আনন্দের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সেই চিরচেনা সম্পর্কও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ৪১ হাজার ৪৯৫টি। এ ছাড়া মুক্ত জলাশয় হিসেবে রয়েছে ২৯৮টি বিল, ১২৮টি খাল, ৩টি বাওড় ও ৪টি পেন কালচার। তবে আবাসিক এলাকা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও কৃষিজমির সম্প্রসারণের কারণে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা খাল, বিল, পুকুর ও ডোবা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে।

একদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা ও খরার কারণে জলাশয় দ্রুত শুকিয়ে মাছের ডিম ছাড়ার প্রাকৃতিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, শীত ও গ্রীষ্মকালে চাষাবাদের সুবিধার্থে অনেক বিল ও খাল সম্পূর্ণ সেচে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এতে মা মাছের বেঁচে থাকার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহারও দেশীয় মাছের সংকটের অন্যতম কারণ। কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল ও মশারি জালের মতো ক্ষতিকর ফাঁদ দিয়ে ডিমওয়ালা মাছ এবং রেণু পোনা নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণ জেলেরা জানান, টাঙ্গাইলের নদ-নদী ও খাল-বিলে একসময় শতাধিক প্রজাতির দেশি মাছের সমারোহ ছিল। বর্তমানে বেশ কিছু প্রজাতি চরম সংকটাপন্ন। আরও অনেক প্রজাতির মাছ বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। সংকটাপন্ন মাছের মধ্যে রয়েছে—চিতল, রিটা, গুজি আইড়, বাঘাইড়, বামোশ, রানি, টেংরা, পাবদা, চাপিলা, শিং, মাগুর, দেশি কৈ, খলিশা, ভেদা (মেনী), ফলি, গজার, চেং, খরকাটি, বালিয়া, চেলা, শাল চোপরা, পোয়া ও শোল মাছ।

বছরের কোনো সময়েই এখন বাজারে আগের মতো মুক্ত জলাশয়ের সুস্বাদু দেশি মাছ পাওয়া যায় না। কখনো অল্পস্বল্প পাওয়া গেলেও তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে জেলার মানুষ দেশি মাছের স্বাদ ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এখন কৃত্রিমভাবে চাষ করা পাঙ্গাস, তেলাপিয়া কিংবা রুই-কাতলার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের আকাল সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলেছে টাঙ্গাইলের পেশাদার জেলেদের।

জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৩০ হাজার ৫০০ জন। এ ছাড়া আরও প্রায় ২০ হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কালিহাতীর ঐতিহ্যবাহী চারান বিল এলাকার জেলেরা জানান, বংশপরম্পরায় মাছ ধরে সংসার চালালেও এখন সারা দিন জাল ফেলেও কয়েক কেজি মাছ পাওয়া কঠিন। জলাশয়ে মাছ কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক মৎস্যজীবী পৈতৃক পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো, দিনমজুরি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।

টাঙ্গাইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর বলেন, মিঠাপানির সুস্বাদু দেশীয় মাছের বিলুপ্তি রোধে মৎস্য বিভাগ বদ্ধপরিকর। উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশি মাছের নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য জেলায় ইতিমধ্যে ১৩টি মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। তবে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় অভয়াশ্রমের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে টাঙ্গাইলের অধিকাংশ খাল-বিল-নালা পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব প্রাকৃতিক জলাশয় পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করে গভীরতা বাড়ানো এবং সব ধরনের দখল ও দূষণ প্রতিরোধ করা জরুরি।