আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া পৃথক মামলার সাজা একসঙ্গে গণনা নয়: হাইকোর্ট

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

কোনো ব্যক্তি একাধিক ফৌজদারি মামলায় পৃথকভাবে দণ্ডিত হলে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া সেই সাজা একই সঙ্গে চলার বা গণনার কোনো সুযোগ নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ে আদালত বলেছেন, পৃথক মামলায় দণ্ড দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট রায়গুলোতে সাজা একই সঙ্গে চলবে— আদালতের এমন স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার পরই ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী মামলার সাজা কার্যকর হবে।

চেক ডিজঅনারের পৃথক ছয়টি মামলায় দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে কারাগারে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের রুল খারিজ করে বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট এই রায় দেন। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

‘মো. নাসির উদ্দিন বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে হাইকোর্ট এ সিদ্ধান্ত জানান। আদালতের মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী।

আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. শাহ আলম। বিবাদীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. সমীর সাত্তার ও মুহাম্মদ আলী আক্কাস চৌধুরী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মহাদ্দেস-উল-ইসলাম (টুটুল) ও মাহফুজ বিন ইউসুফ।

প্রকাশিত রায়ের বিবরণে জানা যায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের (এনআই অ্যাক্ট) ১৩৮ ধারায় দায়েরকৃত চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত পৃথক ছয়টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত হন। এরপর ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

সাজা ভোগ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাকে মুক্তি না দিয়ে বেআইনিভাবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে— এমন অভিযোগ এনে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন এই ব্যবসায়ী।

ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করেন। সাজার মেয়াদ ভোগ করা সত্ত্বেও নাসির উদ্দিনকে কারাগার থেকে মুক্তি না দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন আইনি কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন আদালত।

রুল শুনানিতে রিটকারীর আইনজীবী মো. শাহ আলম দাবি করেন, মামলা বিচারাধীন অবস্থায় নাসির উদ্দিন কারাগারে ছিলেন এবং ওই সময়কে তার সাজা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার অধীনে তার কারাভোগের মেয়াদ সমন্বয় করলে তার সাজা ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে তাকে কারামুক্ত করা উচিত।

অন্যদিকে বিবাদীদের আইনজীবী সমীর সাত্তার আদালতে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি অন্য মামলায় আবার দণ্ডিত হন, সেক্ষেত্রে আদালত যদি স্পষ্টভাবে রায়গুলোতে সাজা একসঙ্গে চলবে বলে নির্দেশ না দেন, তবে একটির সাজা শেষ হওয়ার পরই পরবর্তী সাজা কার্যকর হবে। এক্ষেত্রে বিচারিক আদালত সাজা একসঙ্গে চলার কোনো নির্দেশ দেননি।

তিনি আরও বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের সার্কুলার অনুযায়ী, বিচার চলাকালীন যে মামলায় আসামি হেফাজতে ছিলেন, শুধু সেই নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে বিচারাধীন কারাভোগের সময়সীমা মূল সাজা থেকে বাদ যাবে। এক মামলার সাজা ভোগ বা কারাভোগ অন্য মামলার সাজা কাটাতে ব্যবহার করা যাবে না।

রায়ে আদালত বলেন, ‘বর্তমান রিট পিটিশনে আবেদনকারী এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার আইনি বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি, কিংবা বিচারে বা অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো এখতিয়ারগত ভুল-ত্রুটি প্রমাণ করতে পারেননি। সেই অনুযায়ী, এ আইনের ১৩৮ ধারার অধীনে চলমান ফৌজদারি কার্যধারায় (এই রিট পিটিশনের মাধ্যমে) যেকোনো হস্তক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ আইনত গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা খারিজযোগ্য।’

রায়ে রিটকারী মো. নাসির উদ্দিনকে এই রায় ও আদেশের তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উক্ত সময়ের মধ্যে তিনি আত্মসমর্পণ না করলে নিম্ন আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করবে।

আদালত আরও নির্দেশ দেন, রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ছয়টি মামলার বিচার চলাকালে আসামির কারাভোগের হিসাব সংক্রান্ত একটি ‘ক্যালকুলেশন শিট’ প্রস্তুত করবেন। নিম্ন আদালতের নথি পরীক্ষার পর ওই হিসাব বিবরণী জেল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে, যাতে প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী বিচার চলাকালীন সাজার মেয়াদ থেকে আটক থাকার সময় সঠিকভাবে কর্তন করা যায়। কারা কর্তৃপক্ষ বিচার চলাকালীন আটকের মেয়াদ সঠিকভাবে হিসাব করে রিটকারীর সকল মামলার মোট সাজা থেকে তা বিয়োগ করবেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী বিচার চলাকালীন আসামি নির্দিষ্ট যে মামলায় কারাভোগ করেছেন, কেবল সেই মামলার মোট সাজা থেকেই উক্ত সময় কাটা যাবে।

যেহেতু পৃথক দায়রা মামলাগুলোতে বিচারিক আদালত সাজা একসঙ্গে চলার কোনো আদেশ প্রদান করেননি, তাই ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মামলার সাজা একের পর এক কার্যকর হবে।

আদালত আরও মত দেন, সংশ্লিষ্ট আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ না করা পর্যন্ত রিট এখতিয়ারের অধীনে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই এবং আদালত রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করে বিচারিক আদালতের এসব ফৌজদারি রায়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।