জাতীয় সংসদ নির্বাচন: নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

এবারের নির্বাচনে ৪৫ লাখের বেশি ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু নতুন ভোটারই নন, পুরোনো অনেক ভোটারও আগে কখনো ভোট দিতে না পারায় এবার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ ভোটাররা।
দেশের প্রায় পাঁচ কোটি তরুণ ভোটার আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন। সেই শক্তি নিয়েই নতুন করে ভাবছে তরুণ প্রজন্ম।
তবে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যতটা উচ্ছ্বাস রয়েছে, ততটাই শঙ্কা রয়েছে এর সুষ্ঠু আয়োজন নিয়ে। এই বিপুল তরুণ ভোটারের প্রত্যাশা আদৌ কি প্রতিফলিত হবে আসন্ন নির্বাচনে? সেই প্রশ্নই এখন অনেকের মনে।
রাত পোহালেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দিচ্ছে নানা জল্পনা–কল্পনা। এই জল্পনা–কল্পনার বাইরে নেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। কেমন নির্বাচন চান তারা, নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা? এসব প্রশ্ন ঘিরেই চলছে নানা আলোচনা।
ফোকলোর বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। সেই প্রত্যাশা হলো—নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ হবে বৈষম্যহীন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের এক রাষ্ট্র। আমরা আর গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে চাই না।
নির্বাচনের পর যে সরকারই দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তারা যেন জুলাই অভ্যুত্থানে প্রকাশ পাওয়া জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারে। সেখানে সব রাজনৈতিক দলের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আমরা আশা করি, সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যার মাধ্যমে পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ নতুনভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার জামান খান লেলিন বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন একটি সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হয় এটাই আমাদের প্রধান প্রত্যাশা। বিগত নির্বাচনগুলোতে নাগরিকদের ভোটাধিকার থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ ছিল সীমিত। আমরা চাই, এবারের নির্বাচনে সেই বাস্তবতা বদলাক এবং প্রত্যেক নাগরিক প্রকৃত অর্থেই তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারুক। নাগরিকদের সব সিভিক রাইটস যেন যথাযথভাবে চর্চা করার সুযোগ থাকে, সেটিই আমরা কামনা করি।
নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও আমাদের স্পষ্ট প্রত্যাশা রয়েছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের যেন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। অতীতে যে সরকারগুলো আমরা দেখেছি, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়ে একচেটিয়া চরিত্রের ছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও সংখ্যালঘু জনগণের মতামত যেন পুরোপুরি উপেক্ষিত না হয়। আমরা চাই, সেই জনগোষ্ঠীর কেউ যদি কোনো যৌক্তিক ও বৈধ দাবি উত্থাপন করে, তা গুরুত্ব সহকারে শোনা হোক।
স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল শেলী জানান, আমি একজন প্রথমবারের ভোটার। এটাই আমার প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমরা অনেক অন্যায় ও অবিচারের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, যেগুলোর সুষ্ঠু বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা—তারা যেন এসব ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং দেশে একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
একই সঙ্গে আমি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে।
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল লাবিব বলেন, আগের সরকারগুলোর সময়ে আমরা অনেক সময় কাগুজে বা দেখানো সাফল্য দেখেছি—যেমন সবাইকে জিপিএ ৫ পাওয়াতে জোর দেওয়া বা প্রায় প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা। এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ফল অনেক ক্ষেত্রে ভালো হয়নি। বিভিন্ন কারণে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা খাত অবহেলিত হয়ে পড়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, তারা যেন উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেয়। এতে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং বেকারত্ব কমবে।
এ ছাড়া গত ৩০–৪০ বছরে পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের বাইরে আমরা বড় কোনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত গড়ে তুলতে পারিনি। ভবিষ্যৎ সরকারের যেন নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের খাত তৈরি করা, যাতে দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা যায়।
ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী জয়িতা ফয়সাল বলেন, গত প্রায় ১৫ বছরে দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই এ বছরের নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা যেন দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবার আগে দেশের জনগণের কথা ভাবে।
বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় গিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত লাভ ও সম্পদ অর্জনে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এবার আমরা চাই, নির্বাচিত সরকার নিজের পকেটের কথা না ভেবে জনগণের কল্যাণ ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিক।
ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আফরাজুর রহমান রাহাত বলেন, এবারের নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া। শুধু ভোটগ্রহণের দিন নয়, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হলো সে বিষয়েও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়েও আমাদের বড় প্রত্যাশা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর তাদের দলের কর্মীরা অপরাধে জড়ালে দলীয় পরিচয়ের কারণে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধীকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রেখে শুধু অপরাধী হিসেবেই দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা গেলেই প্রকৃত গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
