রাবিতে র‌্যাগিংয়ের ভিডিও করায় সাংবাদিক-রাকসু নেতাদের মারধর

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১৫:১০ | অনলাইন সংস্করণ

  রাবি প্রতিনিধি

র‌্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণ করায় প্রক্টর ও বিভাগের সভাপতির উপস্থিতিতে ৩ সাংবাদিক ও রাকসু এজিএসসহ দুই নেতাকে মারধর করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় রবীন্দ্র ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

মারধরের শিকার হয়েছেন রাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও [ডেইলি ক্যাম্পাস](https://thedailycampus.com/?utm_source=chatgpt.com) প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন, [ঢাকা পোস্ট](https://www.dhakapost.com/?utm_source=chatgpt.com)-এর জুবায়ের জিসান এবং [দৈনিক মানবকণ্ঠ](https://www.manobkantha.com.bd/?utm_source=chatgpt.com)-এর আবু বকর অনিক।

এছাড়া রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির ও রাকসু বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্করও মারধরের শিকার হন।

অভিযুক্তরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল, সামি (২০২৪-২৫), ওমি (২০২২-২৩), আহমেদ রিয়াদ (২০২২-২৩), জিহাদ (২০১৯-২০), সামির (২০২৩-২৪) ও আতিক (২০১৯-২০)-সহ কয়েকজন শিক্ষার্থী।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্কেটিং বিভাগের তিনজন জুনিয়র শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের মেসেঞ্জারে জানান, ওই বিভাগের সিনিয়ররা তাদের মিট-আপের নামে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে র‌্যাগ দিচ্ছে।

ওইদিন (১৮ জুন) রবীন্দ্র ভবনের পাশের সাইকেল গ্যারাজে তাদের সঙ্গে বসবে বলে জানিয়ে প্রক্টরকে নিয়ে যেতে বলেন তারা। পরে সাংবাদিক ও সহকারী প্রক্টর সেখানে গিয়ে দেখেন, জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ৫টি সারিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ইমিডিয়েট সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন সাংবাদিকরা।

উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ভিডিওতে র‌্যাগিংয়ের কথা অস্বীকার করেন। এরপরই সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হন সিনিয়র শিক্ষার্থীরা এবং তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা ও গালাগালি করেন। জুনিয়ররা বলেন, ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম নিয়ে তাদের সেখানে ডেকেছেন সিনিয়ররা। কিন্তু এভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানোর কারণ জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেননি তারা। অন্যদিকে সিনিয়রদের দাবি, তারা খেলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

সাংবাদিকদের ভিডিও ডিলিট করতে বারবার চাপ দিতে থাকে অভিযুক্ত ও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী। কিন্তু সাংবাদিকরা ভিডিও ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় দফায় দফায় তাদের মারতে তেড়ে আসেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এক পর্যায়ে সেখানে আরও কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত হন। তাদের আটকে রাখা হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। এসময় অভিযুক্তরা নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকে। মামলা করার ভয়ও দেখানো হয়। এরপর সেখানে আসেন রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির ও রাকসু বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর। ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন তারা। তবে কেউ তাদের কথা শুনতে চাননি। উল্টো ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষিপ্ত হন।

পরবর্তীতে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান এবং মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম বোরাক আলী ও ড. নুরুজ্জামান। তারা বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করেন। দুপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয়, প্রক্টর অফিসে বসে সমাধান করা হবে। তবে সেখান থেকে কাউকে যেতে দিচ্ছিল না মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

প্রক্টর অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় হঠাৎ করেই সাংবাদিক আবু বকর অনিককে “আমাদের স্যারের সামনে হাঁটছিস?” বলে মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল মুখে থাপ্পড় ও পেটে লাথি মারে।

এরপর সামি (২০২৪-২৫), ওমি (২০২২-২৩), আহমেদ রিয়াদ (২০২২-২৩), জিহাদ (২০১৯-২০), আতিক (২০১৯-২০) এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। তখন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ঝাঁপিয়ে পড়ে সাংবাদিকদের চড়-কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে।

একই সময়ে সাংবাদিক মিশনের মুখে কয়েকটি থাপ্পড় মারা হয়, সাংবাদিক জুবায়ের জিসানকে মাথা ও পিঠে ঘুষি ও লাথি মারা হয় এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর স্যার দুজনকে তার গাড়িতে তুলে দেন এবং সেখান থেকে উদ্ধার করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসেন।

চলে আসার সময়েও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় এবং বারবার বলতে থাকে, “Marketing is a brand. This is marketing, একদম মেরে সোজা করে ফেলবো।”

সাংবাদিক মিশনকে উদ্দেশ করে ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জিহাদ হুমকি দিয়ে বলেন, “ওরে ভালোভাবে বলেছিলাম ভিডিওটা ডিলিট করতে। ও শুনল না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে ওর অবস্থা খারাপ করে ছাড়ব।”

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মারুফ হোসেন মিশন বলেন, “আমি র‌্যাগিংয়ের খবর পেয়ে প্রক্টর স্যারকে কল করে জানাই। কিছুক্ষণ পরে একজন সহকারী প্রক্টর ঘটনাস্থলে আসেন এবং আমিও তাঁর পিছু পিছু যাই। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমি ভিডিও ধারণ করি। সেখানে সারিবদ্ধভাবে জুনিয়রদের দাঁড় করিয়ে র‌্যাগ দিচ্ছিল সিনিয়ররা। আমাকে ভিডিও ডিলিট করতে চাপ দেওয়া হয় ও গালাগালি করা হয়। ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় কয়েকবার মারতে তেড়ে আসে। এক পর্যায়ে আমাকে, আমার ক্লাবের দুই সাংবাদিককে এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে চড়-কিল-ঘুষি মারে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।”

এ বিষয়ে জানতে কল দিলে মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল বলেন, “আপনি ভুল তথ্য পেয়েছেন। একটা জটলা হয়েছিল, কথা-কাটাকাটি হয়েছে। সেখানে কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি।”

তবে একই বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী মাহির বলেন, “মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমি মারধর করিনি।”

এ বিষয়ে রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, “ওখানে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আমি থামাতে গেলে আমার ওপরও আঘাত আসে। আমরা রাকসুর পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানাই।”

এ বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম বোরাক আলী বলেন, “এ ঘটনার তো মিটমাট হয়ে গেছে। আপনি বিভাগে আসেন। সরাসরি কথা হবে। সরাসরি কথা বললে বেশি ইন্টারেক্টিভ হবে।”

মারধরের বিষয়ে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, “মারধরের অধিকার তাদেরকে কেউ দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কাউকে মারতে পারে না। এটা তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভঙ্গ করেছে। অবশ্যই তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “আমি নিজে সেখানে ছিলাম। সাংবাদিকদের সঙ্গে যে ঘটনাটি হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর এবং বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে আমরা সমাধানের চেষ্টা করেছি। এছাড়া ভিসি স্যার নিজেও বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপরও এ ধরনের ঘটনা আমাদের মধ্যে সংশয় জাগায়। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত অবশ্যই প্রয়োজন এবং যারা দোষী তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটা করবে।”

র‌্যাগিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তাদের যেভাবে আমরা পেয়েছি, তাতে র‌্যাগিংয়ের সব লক্ষণই রয়েছে।”

সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধরের ঘটনায় তিনি বলেন, “আমার সামনেই সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধর করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত জঘন্য অন্যায়। এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।”