শিক্ষক পদ ও অবকাঠামো সংকটে কুবিতে চালু হয়নি নতুন বিভাগ

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৯:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

  কুবি প্রতিনিধি

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন পাওয়ার প্রায় এক দশকেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) নতুন দুটি বিভাগ এখনো চালু করা হয়নি। প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদের বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান এবং মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (বর্তমানে প্রস্তাবিত পরিবেশ বিজ্ঞান এবং লজিস্টিক্স অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজিং) বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষার্থীদের মতে, দুই বিভাগের কার্যক্রম চালু না হওয়ায় উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ, গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্বাচনের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাকালীন সাতটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক বিভাগের সারিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং আইন বিভাগ যুক্ত হয়।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কুবির বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ চালুর অনুমোদন দেওয়া হলেও অবকাঠামো ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে বিভাগ দুটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৯তম একাডেমিক কাউন্সিল সভায় নতুন ১৮টি বিভাগ ও ৪টি অনুষদ চালুর সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে পূর্ব অনুমোদিত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিবর্তে লজিস্টিক্স অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজিং বিভাগ এবং বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের পরিবর্তে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রস্তাব করা হয়। তবে পরবর্তীতে এসব বিভাগ চালুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি বিভাগের অনুমোদন থাকলেও শিক্ষক নিয়োগের পদের বরাদ্দ না থাকায় নতুন বিভাগ চালু করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে সমসাময়িক ও একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত নতুন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট চালু হলেও কুবিতে নতুন বিভাগের দেখা নেই। সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-এ ২০২৩ সালে চারুকলা বিভাগকে অনুষদে উন্নীত করে এর অধীনে তিনটি নতুন বিভাগ—ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং, প্রিন্টমেকিং ও ভাস্কর্য—চালু করা হয়। পাশাপাশি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এ ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ চালু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী প্রমা বড়ুয়া মনে করেন, সময়োপযোগী ও চাহিদাসম্পন্ন বিষয় না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কোনো বিভাগ চালু না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি সমসাময়িক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। ফিশারিজ, বায়োটেকনোলজি ও মাইক্রোবায়োলজির মতো চাহিদাসম্পন্ন বিষয় না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে সীমিত বিভাগের কারণে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও কর্মক্ষেত্রের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।”

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সাকিব হোসেন প্রত্যাশা করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যের নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ও একাডেমিক সংকটের কার্যকর সমাধান হবে।

তিনি বলেন, “অনুমোদনের আট বছর পরও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিভাগ চালু হয়নি, আর প্রস্তাবিত ১৮টি বিভাগের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। সীমিত অবকাঠামো ও শ্রেণিকক্ষ-ল্যাব সংকটের কারণে বিদ্যমান বিভাগগুলোও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। নতুন ক্যাম্পাসের কাজ শেষ হলে এ স্থবিরতা কাটবে বলে আশা করছি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষক থেকে প্রথমবার উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ায় সংকট নিরসনে আমরা আশাবাদী।”

বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ চালুর প্রস্তাবকারী রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ চালুর প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অবকাঠামোগত সংকট। আমি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন থাকাকালীন বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ চালুর প্রস্তাব জানালে তা একাডেমিক কাউন্সিল এবং ইউজিসি থেকে অনুমোদন পায়। আমরা ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিলাম। কিন্তু অবকাঠামোগত সংকটের কারণে তখন এ বিভাগটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া গুণগত মান নিশ্চিত না করে নামমাত্র নতুন বিভাগ চালু করে আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করতে চাইনি।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মাসুদা কামাল জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ খোলার অনুমতি দিলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের পদ বরাদ্দ দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ফলে প্রশাসনিক অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো নতুন বিভাগ চালু করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনরায় নতুন করে ১৮টি বিভাগ এবং ৪টি অনুষদ চালুর অনুমতি চেয়ে ইউজিসির কাছে আবেদন জমা দিয়েছে। ইউজিসি থেকে অনুমোদন পেলেই বিভাগগুলো চালুর প্রক্রিয়া শুরু হবে।”