জুলাইবিরোধী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ঢাবি
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
একই সঙ্গে এসব ব্যক্তি যেসব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোকেও বিচারের আওতায় আনার কথাও বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোজাদ্দেদী আলফেছানী।
হস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অধ্যাপক মোজাদ্দেদী গণমাধ্যমকে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ব্যক্তিবর্গ জুলাই অভ্যুত্থানের বিরোধী ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অনেকে অভিযোগ করেছেন। তার ভিত্তিতে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন সে প্রমাণকে সামনে রেখে সেই ব্যক্তিবর্গ ও তাদের সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিন সন্ধ্যা ৬টায় সিন্ডিকেট সভা শুরু হয়ে রাত পৌনে ১২টায় শেষ হয়।
বৈঠকে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির সদস্যরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোজাদ্দেদী আলফেছানী ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান।
এর আগে নীল দলের শিক্ষকদের বিচার ও নীল দলকে নিষিদ্ধ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানান একদল শিক্ষক।
সোমবার সন্ধ্যায় ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল ও জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক-ইউটিএল সদস্যরা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই দাবি জানান।
সেই শিক্ষকদের দেওয়া অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভ্যূত্থানের বিরোধিতকারীদের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে জানান উপ-উপাচার্য।
সাদা দল ও ইউটিএলের অভিযোগ ২০২৪ সালে ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর সরকারের দমনপীড়নে নিহতের সংখ্যা যখন বাড়ছিল, তখন
১ অগাস্ট নীল দলের এই শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী মহলের ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা আন্দোলন পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে সরাসরি ছাত্রহত্যার পক্ষে অবস্থান নেন।
এর আগে ৩০ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে সেসময়ে সংঘটিত ‘গণহত্যা’র জন্য সরকারের পদত্যাগ দাবি করায় সাদা দলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ করে মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন নীল দলের শিক্ষকরা।
সে বছর ৩ অগাস্ট নীল দলের ব্যানারে তারা একটি র্যালি ও মানববন্ধন করে, সেখানে ব্যানারে ‘কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সকল হত্যা, নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞের দ্রুত বিচার’ দাবি করা হয়।
সে ঘট্না তুলে ধরার পাশাপাশি সাদা দল ও ইউটিএল অভিযোগ করেছে, এই মানববন্ধনের মাধ্যমে নীল দলের শিক্ষক ‘মূলত শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরই ‘নাশকতার জন্য দায়ী করেন’।
সেদিন বিকালে শহীদ মিনার থেকে এক দফা দাবি ঘোষণার পর রাতে নীল দলের এই শিক্ষকরা গণভবনে গিয়ে তৎকালীন ‘স্বৈরাচারী’ প্রধানমন্ত্রীকে ‘প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন’ দিয়ে আসেন।
সাদা দল ও ইউটিএলের দাবি, ওই সভায় নীল দলের কয়েকজন শিক্ষক আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন বলে তারা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছেন।
এছাড়া ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ ও ‘সন্ত্রাসী’ ছাত্রলীগকে সরবরাহ করেছিলেন তারা।
সরকার ও বিরোধী দল সমর্থক এই শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্যে ১৭ তারিখ সকালে তড়িঘড়ি করে সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে বিকালের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সেদিন গায়েবানা জানাজায় পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অবস্থান নিলেও, প্রশাসন ও সিন্ডিকেটে থাকা এই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরং তাদের বিপক্ষে অবস্থান নেন।
এছাড়া তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের কথা বলার অভিযোগ এনেছেন এ শিক্ষকরা।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘অবস্থানের’ অভিযোগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৬৮ জন শিক্ষককে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
পটপরিবর্তনের পর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ‘নিষিদ্ধ’ হওয়া শিক্ষকদের অনেকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় ‘উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ।
আবার কোনো কোনো শিক্ষক ২০২৪ সালের ৩ অগাস্ট ‘নীল দল’ এর মিছিলে অংশগ্রহণ করায় শিক্ষার্থীদের ‘বয়কটের’ শিকার হয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
