রাবিতে সাড়ে ছয় বছরে ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩১ | অনলাইন সংস্করণ
রাবি প্রতিনিধি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বড় একটি অংশ ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া বাসায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ গত ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সম্প্রতি গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একের পর এক অকাল মৃত্যু
২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটি ঘটেছে নিজ বাড়িতে, আর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনা ঘটেছে মেস, ছাত্রাবাস বা ভাড়া বাসায়।
২০২২ ও ২০২৩ সালে একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালেও কয়েকজন শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি ও জুনেও দুজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
মেসেই বেশি আত্মহত্যার ঘটনা
ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বড় একটি অংশ ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে। মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে এসব ঘটনা ঘটেছে।
হলের বাইরে অবস্থান করায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণ, মানসিক পরিবর্তন কিংবা সংকট অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সহপাঠীদের নজরের বাইরে থেকে যায়। ফলে সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
মানসিক চাপ ও একাকীত্ব নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও একাকীত্বসহ নানা বিষয় শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। প্রেম বা সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, একাকীত্ব ও হতাশা থেকেও এমন চিন্তা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় হতাশা বা বিষণ্ণতা অনুভব করলে দ্রুত মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মানসিকভাবে পাশে থাকার মতো মানুষ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের দাবি
একাধিক শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে ক্যাম্পাসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং হলের বাইরে মেস ও ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, মেসে থাকা বা হলে থাকার সঙ্গে আত্মহত্যার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। মেসে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে একা থাকায় সেখানে সংকটের বিষয়টি দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তবে মানসিক সমস্যা, হতাশা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা এবং সম্পর্কজনিত টানাপোড়েনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা, সহশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে। প্রক্টর অফিসও বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে দেখভাল করছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেই শনাক্ত করা, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে মেস ও ছাত্রাবাসগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
