বেরোবির বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায়, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

  বেরোবি প্রতিনিধি

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) সংঘর্ষ ও র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় সাময়িক বহিষ্কৃত মার্কেটিং বিভাগের আট শিক্ষার্থীর মধ্যে সাতজন এখন দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। পরীক্ষা শেষে তারা তৃতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হবেন।

অন্যদিকে, র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় বহিষ্কৃত বাংলা বিভাগের তিন শিক্ষার্থীও বহিষ্কারাদেশের পর একই ব্যাচের সঙ্গে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে তারাও তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, পরবর্তী সময়ে উভয় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সংঘর্ষের ঘটনায় সাময়িক বহিষ্কার

২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর জেন-জি ফুটবল টুর্নামেন্টের একটি খেলাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনায় ওই দিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির জরুরি বৈঠকে মার্কেটিং বিভাগের আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের সাফায়েত হোসেন শুভ, শাহরিয়ার অপু, সজিব, সৌরভ, নাজমুজ সাকিব, রোহান সরকার রোহান ও জিহাদ এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আশরাফুল ইসলাম।

এদিকে, গত ১৯ জুন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সাময়িক বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী সাফায়েত হোসেন শুভ ও শাহরিয়ার অপুকে সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হয়েছে।

ওই সংঘর্ষে নিলয় সরকার নামে এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। তার চোখে আঘাত লাগে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের খরচে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের সাত শিক্ষার্থী বর্তমানে দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। পরীক্ষা শেষে তারা তৃতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হবেন। অন্যদিকে, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আশরাফুল ইসলাম চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পরও তারা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।

এ বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কাছে বহিষ্কারের বিষয়ে কোনো ধরনের চিঠি আসেনি। তাই তারা তাদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাচ্ছেন, ক্লাস করছেন, পরীক্ষাও দিয়েছেন। এ কারণে তাদের শিক্ষাজীবনে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন। ভুল স্বীকার করায় তাদের অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় বহিষ্কৃত তিন শিক্ষার্থীও তৃতীয় বর্ষে

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় ১৬তম ব্যাচের ১২ শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে। এর ভিত্তিতে আব্দুল্লাহ আল মামুন ও রাফি আহমেদকে দুই শিক্ষাবর্ষের জন্য এবং আজিজুল হাকিমকে এক শিক্ষাবর্ষের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট।

গত বছরের ২৬ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৮তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এদিকে, বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে।

বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পরও ওই তিন শিক্ষার্থী একই ব্যাচের সঙ্গে ক্লাস করেছেন এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে তারা তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।

এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইলিয়াছ প্রামাণিক বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সেটি সিন্ডিকেটেও তোলা হয়েছে।’

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারাদেশ থেকে অব্যাহতির বিষয়ে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, যিনি র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন, সেই শিক্ষার্থী অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এ কারণে অভিযুক্তদের শাস্তি মওকুফ করা হয়েছে। বিষয়টি শৃঙ্খলা বোর্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সিন্ডিকেটে তোলা হয়।

কোন সিন্ডিকেটে বিষয়টি তোলা হয়েছিল, জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার বলেন, সেটি তার মনে নেই। তবে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্তটি অনুমোদিত হয়েছে।

শাস্তি প্রত্যাহারে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের মতে, কোনো অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। একইভাবে শাস্তি প্রত্যাহার বা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।

তিনি বলেন, র‌্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থী অভিযোগকারী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে থাকতে পারেন। তাই শুধু তার অভিযোগ প্রত্যাহার বা আবেদনের ভিত্তিতে শাস্তি বাতিল করা যথাযথ কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পুনরায় তদন্ত বা শাস্তি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে।

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কারের বিষয়ে ওই অধ্যাপক বলেন, যথাযথ তদন্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হলে সেই সিদ্ধান্তের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তার মতে, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। শুধু কাউকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিলেই তা যথাযথ বহিষ্কারাদেশ হয়ে যায় না।

এভাবে শাস্তি দেওয়ার পর তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শাস্তি আরোপ এবং পরে তা বাতিল করা হলে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।