প্রযুক্তিনির্ভর কার্ডিওলজির পথে বাংলাদেশ, প্রি-ইভেন্ট অনুষ্ঠিত

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৮:২২ | অনলাইন সংস্করণ

প্রথম ইন্টারন্যাশাল হার্ট ফেলিউর কনফারেন্স-২০২৬ উপলক্ষে প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রবিবার (২৯ মার্চ) রাজধানীর বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আয়োজিত এই কর্মশালায় এআই-ভিত্তিক মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট, কার্ডিয়াক ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (কার্ডিয়াক এমআরআই) এবং এন্ডোমায়োকার্ডিয়াল বায়োপসির আধুনিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এআই-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিকস ও উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, এআই প্রযুক্তি হার্ট ফেইলিউর দ্রুত শনাক্ত, সঠিক নির্ণয় এবং রোগীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে কার্ডিয়াক এমআরআই হৃদযন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা নির্ভুলভাবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বর্ণমান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মশালায় উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি বাংলাদেশে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এআই ও আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির সমন্বয় দেশের হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৫০৭ নম্বর কক্ষে আয়োজিত প্রি-কনফারেন্সের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সফিউদ্দিন।

এআই-ভিত্তিক মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়ার ডিজিটাল হেলথ বিশেষজ্ঞ ডা. সুলতান কাভেরি। এছাড়া বক্তব্য দেন এভায়কেয়ার হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মো. আতাহার আলী।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কার্ডিয়াক এমআরআই ওয়ার্কশপে সভাপতিত্ব করেন কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মনজুর মাহমুদ এবং ভাইস-চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাফর ইকবাল জামালী। প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি হসপিটাল জুরিচের অধ্যাপক ডা. রোবার্ট মানকা, বিএমইউর হার্ট ফেলিউর ডিভিশনের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. দীনে মুজাহীদ মো. ফারুক ওসমানী এবং সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাহিদুল হক।

এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, নিওন্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নানসহ অন্যান্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।

ইন্টারঅ্যাকটিভ এই কর্মশালায় লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন ও ব্যবহারিক সেশনের মাধ্যমে এআই-সহায়ক কার্ডিয়াক ইমেজিং ব্যাখ্যা, কার্ডিয়াক এমআরআই সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজিতে এআই টুলের সংযুক্তি এবং হার্ট ফেইলিউর নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় কেসভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করা হয়। সেশনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল উদীয়মান প্রযুক্তি ও বাস্তব ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমানো, যা কনফারেন্সের থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কার্ডিওভাসকুলার চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। রোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্ণয় ও প্রগনোসিস নির্ধারণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এআই সহায়তা করছে। দ্রুত বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণের মাধ্যমে জটিল ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হচ্ছে। তবে অধিকাংশ এআই টুল এখনও উন্নয়ন বা প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে থাকায় ব্যাপক ব্যবহারের আগে যথাযথ যাচাই প্রয়োজন।

কর্মশালায় উল্লেখ করা হয়, কার্ডিয়াক এমআরআই একটি উচ্চ রেজোলিউশনের নন-ইনভেসিভ ইমেজিং পদ্ধতি, যেখানে কোনো রেডিয়েশন এক্সপোজার নেই। এটি হার্ট ফেইলিউর রোগীদের সঠিক নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এআই ও কার্ডিয়াক এমআরআই-এর সমন্বয়ে কার্ডিয়াক স্ট্রাকচারের স্বয়ংক্রিয় সেগমেন্টেশন, দ্রুত ইমেজ প্রসেসিং ও রিপোর্টিং, ভেন্ট্রিকুলার ফাংশনের পরিমাণগত মূল্যায়ন এবং সূক্ষ্ম মায়োকার্ডিয়াল অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ সহজ হচ্ছে। ফলে দক্ষতা বাড়ছে এবং পর্যবেক্ষকভেদে পার্থক্য কমছে।

বাংলাদেশে এ প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নের জন্য উন্নত কার্ডিয়াক ইমেজিং সেন্টার স্থাপন, এমআরআই-সামঞ্জস্যপূর্ণ সফটওয়্যার ও এআই টুলের প্রাপ্যতা, নির্ভরযোগ্য ডেটা সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।

পাশাপাশি প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি, ব্যয় কমানো, নীতিমালা ও নৈতিক কাঠামো প্রণয়ন, ডেটা গোপনীয়তা ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এআই টুল যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রি-কনফারেন্স ওয়ার্কশপ বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর কার্ডিওলজির নতুন যুগের সূচনা করেছে। এআই ও কার্ডিয়াক এমআরআই-এর সমন্বয় হার্ট ফেইলিউরের প্রাথমিক নির্ণয়, ঝুঁকি নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তিকে নিয়মিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।