গাজার তাঁবুতে মানবেতর জীবন
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ভোগান্তি কমেনি সেখানকার বাসিন্দাদের। দুই বছর ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় উপত্যকাটির অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁবু টানিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের, যেখানে বসবাসের ন্যূনতম কোনো পরিবেশ নেই। ফলে শ্বাসকষ্ট ও পেটের পীড়াজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আবু আমর পরিবার ১৭ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতিবার স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের জীবন আরও সংকুচিত হয়েছে। উপায়ন্তর না পেয়ে গাজার রিমাল এলাকায় আবর্জনার ভাগাড়ের পাশে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছে পরিবারটি। দূষণ, অসুস্থতা ও অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের।
মানবেতর কাহিনি : ৬৪ বছর বয়সী আবু আমর বলেন, গাজায় আমরা দুটি যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করছি- একটি বোমা হামলা, অপরটি আবর্জনা। আমার অ্যাজমার সমস্যা আছে। এজন্য সব সময় ইনহেলার সঙ্গে থাকে। রাতে আমি সেটি বালিশের নিচে রাখি। ময়লার দুর্গন্ধে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকবার এটি ব্যবহার করতে হয়। আমরের পুত্রবধূ পাঁচ সন্তানের জননী সুরাইয়া আবু আমর। তিনি বলেন, তাঁবুতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এখানে পানির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে মাসে কয়েকবার পেটের পীড়ায় ভুগতে হয়। অথচ সুরাইয়াদের জীবন এমন ছিল না। তারা বাইত আল-লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা নগরীতে আশ্রয় নিয়েছেন। ইসরায়েলের হামলার আগে তাদের জীবন ছিল পরিপাটি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি কখনও কল্পনাও করতে পারেননি, এমন দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস করতে হবে।
হতাশা : ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলায় গাজার বেশির ভাগ ভবন ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা চলছেই। যুদ্ধবিরতির পর এ পর্যন্ত চার শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। এসব হামলা গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে ইসরায়েলের পরিকল্পিত চেষ্টা বলে মনে করেন অনেক ফিলিস্তিনি। তাদের একজন সেলিম। তিনি বলেন, বর্জ্যরে পাশে থাকার কারণে তাদের হতাশা গ্রাস করেছে। তিনি বলেন, আমার সন্তানেরা শীত ও গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছে। এখানে বাতাসের সঙ্গে দুর্গন্ধ নাকে আসে। খেতে বসলে খাবারও পেটে যায় না, বমি আসে। সেলিম আরও বলেন, ঝড়ের সময় নিয়মিত নর্দমার পানি তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়ে। তিনি বলেন, ঝড়-বাতাস হলে নর্দমার পানি তাঁবুর ওপর চলে আসে। কখনও কখনও আমাদের কাপড়েও ছিটে আসে। আমাদের কাছে বাড়তি কোনো পরিষ্কার কাপড়ও নেই। বাইত লাহিয়া থেকে কাপড় ছাড়াই পালিয়েছি। কখনও কখনও আমাকে নোংরা কাপড়ে নামাজ আদায় করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিশুরা বেশি সমস্যায় পড়েছে। ১৩ বছর বয়সী শিশু রাহাফ বলছে, পরিচ্ছন্নতার অভাবে আমার চুল পড়ছে, ত্বকেও সংক্রমণ হয়েছে।
স্বাস্থ্য-সংকট : চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ময়লা-আবর্জনা, নর্দমার পানির কারণে এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে গাজায় রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গাজার আশ-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের ফুসফুস বিভাগের প্রধান আহমেদ আর-রাবিই বলেন, গাজার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি। ফলে এত কঠিন জটিলতা হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে আমরা কখনও দেখিনি বা মোকাবেলা করতে হয়নি। গাজার মিউনিসিপ্যাল কর্মকর্তাদের মতে, গাজা নগরী মানবিক ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। ইসরায়েলের হামলায় সেখানকার পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজা মিউনিসিপ্যালিটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আহমেদ দিরিয়েমলি বলেন, গাজা নগরীর ভেতরে দেড় লাখ মিটার বেশি পাইপ এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ পানির কূপ ধ্বংস হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে। গাজার পূর্বাঞ্চলে বর্জ্য ফেলার জায়গায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল। ফলে শহরজুড়ে বর্জ্যরে স্তূপ জমে গেছে। গাজা মিউনিসিপ্যালিটির মুখপাত্র হুসনি মুহানা বলেন, উপত্যকায় ৭ লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমা হচ্ছে। যার মধ্যে শুধু গাজা নগরীতেই জমেছে সাড়ে তিন লাখ টনের বেশি বর্জ্য।
