যৌথ হামলায় ধ্বংস হয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু সেতু
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির কারাজ শহরে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু হিসেবে পরিচিত বি১ সেতুতে বোমা হামলা চালিয়ে সেটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
একই সময় তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক স্থাপনাকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) পরিচালিত এসব হামলায় কারাজের নির্মাণাধীন বি১ সেতুর ওপর তিনটি বোমা ফেলা হয়, এতে সেতুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। প্রায় ৪৪৬ ফুট উচ্চতার এই সেতুটি একটি বেসামরিক মহাসড়ক প্রকল্পের অংশ ছিল এবং এর সঙ্গে সামরিক কার্যক্রমের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সেতুটি ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এ হামলায় অন্তত দুইজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সেতুটি ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন এবং ইরানকে দ্রুত চুক্তিতে না এলে বড় ধরনের ক্ষতির হুঁশিয়ারি দেন।
এর আগে, জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর আরও ভয়াবহ হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়ে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেন। একই মন্তব্য পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পুনরাবৃত্তি করলে তা ইরানসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
তেহরানে হামলার ঘটনায় শতবর্ষ পুরোনো একটি চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রও ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশটির পাস্তুর ইনস্টিটিউট পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি বিশ্বস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান ছিল।
তেহরানের এই প্রতিষ্ঠানটি প্লেগ, গুটিবসন্ত, কলেরা, জলাতঙ্ক, হেপাটাইটিস বি ও যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় গবেষণা ও টিকা উন্নয়নে কাজ করত। যদিও অতীতে এটিকে জীবাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য স্থান হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছিল।
একই দিনে তেহরান ও অন্যান্য অঞ্চলে আরও কয়েকটি বেসামরিক স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী আলোচনায় যুক্ত এক শীর্ষ আলোচকের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনাও রয়েছে।
ইরানি বিরোধী কর্মী বেহনাম আমিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, জনগণকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন তাদের ধ্বংসের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সংঘাতের প্রভাব দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬০০ জনের বেশি ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৪৪ জন শিশু রয়েছে। তেহরান সিটির এক মুখপাত্র জানান, এই যুদ্ধে ৩৩ হাজার আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি তেহরানে তার বাসভবনে হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন এবং এ ঘটনায় তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন। তিনি সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে একটি অ্যামাজন ক্লাউড ডেটা সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা মাইক্রোসফট, গুগল ও অ্যাপলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানিয়েছে, তারা ইরানের হামলার মুখে পড়েছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৬টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে মোট ৪৫৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২ হাজার ৩৮টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
