চীন সফর শেষে তাইওয়ানকে স্বাধীনতা ঘোষণায় সতর্ক করলেন ট্রাম্প

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ১১:২২ | অনলাইন সংস্করণ

চীন থেকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে তাইওয়ানকে সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

“আমি চাই না যে কেউ স্বাধীনতার দিকে যাক,” বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের সম্মেলনের শেষে শুক্রবার তিনি ফক্স নিউজকে এমনটাই বলেছেন।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এর আগে বলেছিলেন, তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন নেই, কেননা এখনি তারা নিজেদেরকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে দেখে।

বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে সমর্থন-সহায়তা দিয়ে আসছে: দ্বীপটির আত্মরক্ষায় যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহে তারা নিজেদের আইনেই বাধ্য। ওয়াশিংটনকে প্রায়শই এ মিত্রতা এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাঝে সামঞ্জস্যও রাখতে হয়েছে।

স্বশাসিত এ দ্বীপটি নিয়ে তিনি ‘কোনো দিকেই প্রতিশ্রুতি দেননি’। চীন তাইওয়ানকে তার নিজের অংশ মনে করে এবং দ্বীপটিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়তে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও কখনো খারিজ করেনি।

ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এক চীন’ নীতিতেই বিশ্বাসী, যে অবস্থানের মানে হচ্ছে—তাইওয়ান চীনেরই অংশ। আবার একইসঙ্গে দ্বীপটির সুরক্ষায়ও তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বছরের পর বছর মার্কিন প্রশাসনগুলো এ ‘কৌশলগত ধোঁয়াশা’ ধরে রেখেছে এবং তাইপেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।

তাইওয়ানের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ প্রেসিডেন্টকে অপছন্দের কথা বেইজিং কখনোই গোপন রাখেনি, তারা লাই চিং-তে’কে আগেও ‘সমস্যা সৃষ্টিকারী’ ও ‘প্রণালির উভয় পাড়ের শান্তি বিনষ্টকারী’ আখ্যা দিয়েছিল।

বিবিসি বলছে, তাইওয়ানের অনেকে নিজেদের পৃথক দেশ হিসেবে দেখতে পছন্দ করলেও দ্বীপটির সিংহভাগ মানুষই চীনের সঙ্গে এখনকার ‘ধোঁয়াশাপূর্ণ’ সম্পর্কই বজায় রাখতে চান; অর্থ্যাৎ, তারা চীনের সঙ্গে একীভূতও হতে চান না, আবার স্বাধীন হতেও নারাজ।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাইওয়ান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যে বদলায়নি তা পুনর্ব্যক্ত করেন।

“আপনি জানেন, আমাদের সেক্ষেত্রে যুদ্ধের জন্য সাড়ে ৯ হাজার মাইল (১৫ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার) পাড়ি দিতে হবে। তেমনটা হোক আমি চাই না। আমি চাই তারা ঠাণ্ডা হোক। চীন ঠাণ্ডা হোক,” বলেছেন তিনি।

ওয়াশিংটনে ফিরে আসার ফ্লাইটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের জানান, তিনি এবং শি তাইওয়ান নিয়ে ‘অনেক’ কথা বলেছেন। তবে স্বশাসিত এ দ্বীপটির সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়াবে কিনা—ট্রাম্প তা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

দ্বীপটির ব্যাপারে শি ‘একেবারেই অনমনীয়’ এবং তারা স্বাধীনতা নিয়ে কোনো ধরনের ‘নড়াচড়া করুক’ তা চান না, বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এর আগে বেইজিংয়ে বৈঠকে শি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, “তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিষয়টি ভুলভাবে সামাল দেওয়া হলে দুই দেশ মুখোমুখি সংঘাতে জড়াতে পারে বা এমনকী সংঘর্ষও হতে পারে।”

তাইওয়ান নিয়ে চীনের সঙ্গে সংঘাত দেখছেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “না। আমার মনে হয় না। আমরা ঠিক আছি বলেই মনে হয়। (শি’ও) যুদ্ধ দেখতে চান না।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন স্বশাসিত দ্বীপটির আশপাশে সামরিক মহড়ার পরিমাণ ও মাত্রা ক্রমশ বাড়িয়ে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টির পাশাপাশি ভারসাম্যেও আঘাত হানছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন অত্যাধুনিক রকেট লঞ্চার ও নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রসহ তাইওয়ানে এক হাজার ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্রশস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানায়। বেইজিং ক্রমাগত এর নিন্দা করে আসছে।

ওই অস্ত্র বিক্রি হবে কি হবে না সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। বলেছেন, এ প্রসঙ্গে তার এবং শি-র বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

“আমি বলব, আমাকে এখন সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হবে, যিনি এখন তাইওয়ান চালাচ্ছেন—আপনি জানেন, আমি কার কথা বলছি,” বলেছেন তিনি।

তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন না। এ ধরনের সরাসরি কথোপকথন বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নতুন উত্তেজনারও কারণ হতে পারে।

“আমরা যুদ্ধ চাই না। যদি এখনকার অবস্থা বজায় থাকে, তাহলে আমার মনে হয় চীন তা মেনে নেবে। কিন্তু আমরা এটা চাই না যে কেউ বলুক—চলো আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পেছনে আছে,” ফক্স নিউজকে বলেছেন ট্রাম্প।

ওয়াশিংটন তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধী—এমন এক বিবৃতি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলেছিল। সেসময় বেইজিং বলেছিল, এ কাণ্ড ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে ভুল বার্তা দেবে’।

এর প্রতিক্রিয়ায় তাইওয়ানে থাকা মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা বলে আসছি যে, এখনকার যে স্থিতাবস্থা তার যে কোনো একতরফা বদলের বিরোধী আমরা।”

তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং বলেছেন, তার দল যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্মেলনের দিকে নজর রেখেছিল এবং ‘তাইওয়ান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের স্থিতিশীল ও গভীর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে এবং তাইওয়ানের স্বার্থ রক্ষা করতে’ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

লিন বলেছেন, তাইওয়ান সবসময় এই অঞ্চলের ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতার অভিভাবকের’ দায়িত্ব পালন করে আসছে। চীন তাদের ‘আগ্রাসী সামরিক কর্মকাণ্ড ও কর্তৃত্ববাদী নিপীড়নের’ মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়িয়ে চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।