সাগর পথে ইউরোপে অবৈধ প্রবেশে শীর্ষে বাংলাদেশিরা
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়েনে (ইইউ) অনিয়মিতভাবে সীমান্ত পারাপারের ঘটনা অব্যাহতভাবে কমেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ ধরনের প্রবেশের ঘটনা কমেছে ৩৫ শতাংশ। তবে ভূমধ্যসাগরের প্রধান দুটি সমুদ্র পথে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশে বাংলাদেশিরা শীর্ষস্থানে রয়েছেন।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইউরোপের সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রকাশি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ৭৫ হাজার অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। প্রধান অভিবাসনপথগুলোর প্রায় সবকটিতেই এ প্রবণতা দেখা গেছে।
অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে অব্যাহত সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাস্থলগুলোতে নেওয়া প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের কারণে ইউরোপের দিকে যাত্রা করা নৌকার সংখ্যা কমে আসছে বলে মনে করছে ফ্রন্টেক্স।
তবে জুলাইয়ের শেষ দিকে মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা (Ceuta) অঞ্চলে মানুষের ব্যাপক প্রবেশের ঘটনা এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ঘটনার চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণের সম্ভাবনাও নেই। কারণ, সীমান্ত অতিক্রমকারীদের বেশিরভাগই নিবন্ধিত না হয়েই মরক্কোতে ফিরে গেছেন।
শুধু আগস্টেই প্রায় ১০ হাজার ৭০০টি অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় এ সংখ্যা ৩৮ শতাংশ কম। সাধারণত গ্রীষ্মকাল বছরের ব্যস্ততম সময় হলেও এবারও এই পতন দেখা গেছে।
এই সময়ের মধ্যে ইইউর অভিবাসন ও আশ্রয়সংক্রান্ত নতুন ‘প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’র অধীনে প্রথম পূর্ণ গ্রীষ্মকালও পার হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ইইউর বহির্সীমান্তে অভিবাসীদের যাচাইয়ের জন্য একটি একক ও মানসম্মত স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
এই নতুন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে সদস্য দেশগুলোকে সহায়তা করছে ফ্রন্টেক্সের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে আগত ব্যক্তিদের জাতীয়তা নির্ধারণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং নথিপত্র যাচাই।
অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের সংখ্যা কমতে থাকলেও মানবিক মূল্য কমেনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ফ্রন্টেক্স বলেছে, প্রতিটি মৃত্যুই সেই ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়, যে ঝুঁকি নিতে মানুষ বাধ্য হচ্ছে। মানব পাচারকারী চক্রগুলো আবহাওয়া বা পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও চলাচলের অনুপযোগী নৌকায় মানুষকে সমুদ্রে পাঠিয়ে যাচ্ছে।
ইইউর বহির্সীমান্তে বর্তমানে ৩ হাজার ৮০০ কর্মকর্তা মোতায়েন রয়েছে। ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষা এবং সমুদ্রে মানুষের জীবন রক্ষায় জাতীয় কর্তৃপক্ষগুলোকে সহায়তা করে যাচ্ছে ফ্রন্টেক্স।
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথ ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত অভিবাসনপথ। এ পথে ২৪ হাজার ২০০-এর বেশি সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। পুরো সময়ের হিসাবে লিবিয়া থেকে ক্রিট দ্বীপমুখী করিডরটি ছিল এ পথের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ। তবে জুলাই নাগাদ তুরস্কের সঙ্গে স্থলসীমান্ত এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে ছাড়িয়ে এ পথের সবচেয়ে ব্যস্ত অংশে পরিণত হয়।
আগস্টে এ পথে প্রায় ৩ হাজার সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এ পথে শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের প্রধান জাতীয়তার মধ্যে ছিলেন আফগান, সুদানি ও বাংলাদেশি নাগরিক।
মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জনের ইউরোপে প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৫৫ শতাংশ কম। সব অভিবাসনপথের মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন। এ পথে লিবিয়া প্রধান যাত্রাস্থল হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। মোট প্রবেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই লিবিয়া থেকে হয়েছে। এরপর ছিল আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে আসা অভিবাসনপথ।
লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার কর্তৃপক্ষের আইন প্রয়োগকারী অভিযান, আটক অভিযান এবং ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমের ফলে এ পথ দিয়ে নৌযাত্রা কমে এসেছে। এ পথে শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি, সোমালি ও আলজেরীয় নাগরিকদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।
প্রধান অভিবাসনপথগুলোর মধ্যে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথই একমাত্র পথ, যেখানে প্রবেশের ঘটনা বেড়েছে। এ পথে প্রায় ১৫ হাজার ৯০০টি অনিয়মিত সীমান্ত পারাপার শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। তবে জুলাইয়ের শেষ দিকে সেউতায় সংঘটিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনাগুলো এই মোট সংখ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। আলজেরিয়া এ পথের প্রধান যাত্রাস্থল হিসেবে রয়েছে। আর প্রধান গন্তব্য ছিল বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ ও স্পেনের মূল ভূখণ্ড।
জুলাইয়ে এ পথের চাপ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং মাসিক হিসাবে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। আগস্টে আবার তা কমে আসে। মরক্কো এবং পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী পথগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় মানব পাচারকারী চক্রগুলো তাদের পথ পরিবর্তন করেছে। এর ফলে আলজেরিয়ার উপকূল থেকে যাত্রা আরও বেড়েছে বলে মনে করছে ফ্রন্টেক্স।
পশ্চিম আফ্রিকান পথে প্রায় ৫ হাজার ১০০টি সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। সব পথের মধ্যে এ পথেই সবচেয়ে বেশি, ৫৮ শতাংশ, পতন হয়েছে। মরিতানিয়ার নেওয়া প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক সময়ে স্পেন ও ইইউর সহযোগিতায় সেনেগালের নেওয়া পদক্ষেপের ফলে নৌযাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে এ পথের পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। জুলাইয়ে মৌসুমি কারণে প্রবেশের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ সময় গাম্বিয়া, সেনেগাল এবং এমনকি গিনি-বিসাউ থেকে যাত্রা করা নৌকার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এর ফলে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রাকারী এসব নৌকার যাত্রীদের আরও দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের উদ্দেশ্যে শনাক্ত হওয়া প্রচেষ্টার সংখ্যাও কমেছে। এই হিসাবের মধ্যে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো এবং ফ্রান্সের উপকূল থেকে যাত্রার আগেই বাধাপ্রাপ্ত-উভয় ধরনের ঘটনাই অন্তর্ভুক্ত।
প্রথম আট মাসে এ ধরনের প্রচেষ্টা ৪৩ শতাংশ কমে প্রায় ২৬ হাজার ৬০০টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে গ্রীষ্মকালজুড়ে এ ধরনের পারাপারের চেষ্টা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। মানব পাচারকারী চক্রগুলো অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা ব্যবহারের প্রবণতা আরও বাড়িয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি নৌকায় ১৬৫ জনকে বহন করতে দেখা যায়।
এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি আগামী মাসগুলোতে ফ্রান্সের উপকূলজুড়ে টহল আরো জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
