হুতিরা ফোনে আমাকে বলেছে, তারা লড়াই করতে চায় না: ট্রাম্প

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিতে অনুরোধ করেছে।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে শনিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, 'হুতিরা আমাদের ফোন করেছে। তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। তারা চায় না আমরা তাদের বিরুদ্ধে যাই।'

তিনি আরও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই সামাল দেওয়া যাবে।

এদিকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ইরানই সম্ভবত এ হামলার জন্য দায়ী।

হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য এটি অন্যতম প্রধান পথ।

ইরান হামলার জন্য দায়ী কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, 'আমার মনে হয়, সম্ভবত তারাই।'

ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাকে 'ভালো বন্ধু' বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরান নয়, ইরাক থেকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোন হামলার জন্য দায়ী। এসব হামলায় মানুষ আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদ।

সৌদি আরব বলেছে, তারা এখনই পাল্টা ব্যবস্থা নেবে না। এর মাধ্যমে ইরাক সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

তবে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই সঙ্গে বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, স্থাপনা ও জনগণকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

ইরাক সরকারও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তদন্তে হামলাটি ইরাক থেকে হয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্তের কথা জানিয়েছে।

ইরাকের দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে ইরাক। হামলাকারীদের ধরতে বড় ধরনের অভিযানও চলছে।

এদিকে গত সপ্তাহের টানা অভিযানের পর শুক্রবার ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল দখলে নেয় হুতিরা। এর আগে তারা দ্রুত অভিযান চালিয়ে তিনটি কৌশলগত দ্বীপও দখল করে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।

সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় উপসাগরীয় পথ দিয়ে সৌদির তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ। হরমুজ প্রণালির অবরোধের পর দেশটি বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে।

ট্রাম্প বলেছেন, হুতিরা বেশির ভাগ জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। তবে একটি দেশের জাহাজ নিয়ে তারা অসন্তুষ্ট। সেটি নিয়ে তিনি সমাধানের কথা বলেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে দুইবার ফোন করেছিলেন। তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ করেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এর মধ্যেই চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতিরা।

অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী শনিবার হুতিদের নিয়ন্ত্রিত কৌশলগত বন্দরনগরী মোখায় হামলা চালিয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, মোখা বন্দরের কাছে হুতিদের কয়েকটি যান ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। কয়েকজন হুতিও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।ই-পেপার সাবস্ক্রাইব করুন

সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি বলেছেন, মোখা-ধুবাব সড়কেও হুতিদের যান ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এলাকাটি মোখা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে।

শুক্রবারও মোখায় গোলাবর্ষণ শুরু করার কথা জানিয়েছিল সরকারি বাহিনী। একই সঙ্গে তাইজ-মোখা ও মোখা-ধুবাব সড়ক ব্যবহার না করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার মোখা দখল করে হুতিরা। তাদের হামলার পর বহু মানুষ শহর ছেড়ে এডেনে চলে যান। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান ঘাঁটি এই এডেনে।

শুক্রবার হুতি-সমর্থিত গণমাধ্যম জানিয়েছে, সৌদি বাহিনী মোখা বিমানবন্দরে দুটি হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহরের সমুদ্রবন্দরে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

গত সপ্তাহে শুরু হওয়া হুতিদের এই অভিযানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে উভয় পক্ষের সূত্র জানিয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ইয়েমেনে ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বর্তমান সংঘাত সেই যুদ্ধেরই নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা।

শুক্রবার হুতিদের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লোহিত সাগরের উপকূলে তারা আরও অগ্রসর হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে 
হামলার জবাব হামলা দিয়ে' উত্তেজনা বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে হুতিরা বলেছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া সব কোম্পানির জন্য সমুদ্রপথ নিরাপদ।

তবে পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাজারে উদ্বেগ রয়েছে। হুতিদের কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

জুলাইয়ে অবরোধ ঘোষণার পর থেকেই লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে হুতিরা। সৌদি আরবের ভেতরের তেল স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে।

হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবরোধের জবাবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, মোখা দখল ঠেকাতে সৌদি বিমানবাহিনী কোনো বড় হামলা না চালানোয় তারা বিস্মিত। তার মতে, বড় ধরনের বিমান অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি পায়নি সৌদি আরব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্র বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। এই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে হুতিরা।

২০২৩ সালের শেষ দিকে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরুর পর থেকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তখন থেকে হুতিরা বিভিন্ন জাহাজে হামলা শুরু করে।

চলতি বছর সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দেব ব্যবহার বাড়িয়েছিল। তবে নতুন করে হুতিদের হুমকির কারণে সেই চলাচল আবার কমেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স।

এখন সৌদি আরবকে আরও একটি বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে। লোহিত সাগরের উত্তর দিক দিয়ে ভূমধ্যসাগরে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে তারা। এ জন্য সুয়েজ খাল বা মিসরের একটি পাইপলাইন ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছাতে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

এই পথও হুতিদের হুমকির বাইরে নয়। আগস্টের শেষ দিকে লোহিত সাগরের উত্তর অংশে একটি সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছিল হুতিরা।