অনলাইন সংস্করণ
১৪:৪৪, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সিনেটে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম আমেরিকান।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ জয়ী হতে যাচ্ছেন বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডিসিশন ডেস্ক এইচকিউ। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটের উচ্চকক্ষে যাওয়ার পথে রয়েছেন তিনি। নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম আমেরিকান হিসেবে সিনেটে দায়িত্ব পালন করবেন এল-সায়েদ।
পেশায় চিকিৎসক এল-সায়েদ এর আগে ডেট্রয়েট ও ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন তিনি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন মিশিগানে।
বুধবার ভোর পর্যন্ত ৫২ শতাংশ ভোট গণনা শেষে এল-সায়েদ ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিলেন। অন্যদিকে রজার্স পেয়েছিলেন ৪৭ শতাংশের বেশি ভোট।
এল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারের প্রধান বিষয় ছিল স্বাস্থ্যসেবা এবং মিশিগানের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। তবে প্রচারের সময় তাঁর মুসলিম ধর্মবিশ্বাস এবং ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে অবস্থানকে কেন্দ্র করে নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।
নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরেও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্স এবারের গ্রীষ্মে দলীয় প্রাইমারিতে এল-সায়েদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনের নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি আকস্মিকভাবে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।
স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতারা ক্ষুব্ধ হন। দলের শীর্ষ নেতারা একে 'বিশ্বাসঘাতকতা' বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর নির্বাচনী দপ্তরের কয়েকজন কর্মীও পদত্যাগ করেন।
স্টিভেন্স দাবি করেন, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী অনলাইন ভাষ্যকার হাসান পাইকারের সঙ্গে এল-সায়েদের সম্পর্কের কারণেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর আগে স্টিভেন্স রজার্সকে প্রেসিডেন্টের 'বিপজ্জনক রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্ধ সমর্থক' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
তবে স্টিভেন্সের আকস্মিক সমর্থন ঘোষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেননি এল-সায়েদ। বরং ওই ঘোষণার পর মাত্র চার ঘণ্টায় তাঁর নির্বাচনী তহবিলে ১২ লাখ ডলার জমা পড়েছে বলে জানান তিনি।
২০২৪ সালের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন মাইক রজার্স। ওই নির্বাচনে ট্রাম্প মিশিগানে জয়ী হলেও সিনেট আসনটি জিততে পারেননি রজার্স।
এবারের নির্বাচনী প্রচারে রজার্স এল-সায়েদকে উগ্রপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে মুসলিম ব্রাদারহুড নামের ইসলামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন এল-সায়েদ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে শেষ মুহূর্তের প্রচারে অংশ নেন ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এ সময় ট্রাম্প এল-সায়েদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প তাকে 'সহিংস সন্ত্রাসী' বলে আখ্যায়িত করেন। তবে রজার্স পরে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের সঙ্গে একমত হতে অস্বীকৃতি জানান। ট্রাম্প এল-সায়েদকে তার মধ্যনাম 'মোহাম্মদ' বলেও সম্বোধন করেন।
‘তিনি আমার নাম কীভাবে উচ্চারণ করেন, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। এমনকি তিনি আমার পুরো নাম মনে রাখলেন কি না, সেটিও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ নভেম্বরের পর তিনি আমাকে শুধু ‘সিনেটর’ বলেই ডাকতে পারবেন। আপনার কাছে আমি সিনেটর মোহাম্মদ হয়েই থাকব, ভাই।’
হাসান পাইকারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর তার নির্বাচনী প্রচার থেকেও দূরত্ব বজায় রাখার পদক্ষেপ নেন এল-সায়েদ।
মিশিগানের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসসহ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী নেতাদের সমর্থন পান এল-সায়েদ।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতেও রজার্সের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন তিনি। নির্বাচনের আগের সপ্তাহান্তে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে এল-সায়েদ ১১ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
এ ছাড়া কয়েকটি বড় নির্বাচনী পূর্বাভাস সংস্থা মিশিগানের এই আসনকে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের অনুকূলে বিবেচনা করতে শুরু করে। এতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের সাফল্যের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়।
আবদুল এল-সায়েদের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে। তাঁর বাবা-মা মিসরীয় অভিবাসী।
পেশায় চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এল-সায়েদ এর আগে ডেট্রয়েট ও ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে তাঁর জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হতে যাচ্ছে। নির্বাচিত হলে মার্কিন সিনেটে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম আমেরিকান হবেন তিনি।
সূত্রে প্রকাশিত নির্বাচনী পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল-সায়েদ জয়ী হয়েছেন। তবে পূর্বাভাস ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়িত নির্বাচনী ফল এক বিষয় নয়।