যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন
যে ৫ কারণে এমন ভরাডুবি হলো ট্রাম্পের দলের
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২১:০৫ | অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণও চলে গেছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছুটা খারাপ ফল করে থাকে। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতাকে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভোটের প্রবণতা বদলে যাওয়া- বেশ কয়েকটি বিষয় রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দলটির বড় পরাজয়ের পাঁচটি কারণ তুলে ধরা হলো।
১. জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছিলেন ভোটাররা। গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে প্রচারের সময় মানুষের সেই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
নির্বাচনের আগে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ছে, মুদি পণ্যের দাম বাড়ছে, সবকিছুর দামই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান ছেড়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলেও জানান।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জ্বালানি ও শক্তির দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির এই চাপ আরও বেড়েছে। অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৬ ডলার ৫২ সেন্টের রেকর্ড দামের কাছাকাছি পৌঁছায়। গত সেপ্টেম্বরে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ৬ ডলার ৫২ সেন্টে উঠেছিল, যা ছিল সর্বোচ্চ।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে ৭৯ শতাংশ ভোটার এবং তাদের পরিবার মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে প্রায় আটজনই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।
আর ১০ জনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি ভোটার এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের নীতির কারণেই স্বাভাবিকের তুলনায় পণ্যের দাম বেশি।
২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়।
বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল পাম্পগুলোতেও। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানির বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে মার্কিন নাগরিকদের।
যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষের কাছেই জনপ্রিয়তা পায়নি। বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ সমর্থকদের কাছে এটি ছিল তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বলে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভুল ছিল। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বা বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্পও স্বীকার করেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক হস্তক্ষেপ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।
৩. ডেমোক্র্যাটদের সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রচার
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ব্যবধানে জয়ের পেছনে শক্তিশালী প্রার্থীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছেন।
প্রচারে তারা জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছেন। ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যাকে সামনে রেখে তাদের বক্তব্য ছিল সুনির্দিষ্ট। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বার্তা সহজে পৌঁছেছে।
টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসে যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা এমনভাবে তুলে ধরেন, যা ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে সাড়া ফেলে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয়কে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে। পেশায় সাবেক শিশু চিকিৎসক অ্যান্ড্রুজ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করেন এমন অনেক ভোটারের কাছে তার এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্যতা পায়।
মিশিগানে জয়ী হয়ে ডেমোক্র্যাটদের আসন ধরে রেখেছেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা আবদুল এল-সায়েদ। রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো ও সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানোর বিষয়টিকে তিনি প্রচারের অন্যতম প্রধান স্লোগান করেন।
জর্জিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। ৩৯ বছর বয়সী এই নেতার জয় বেশ স্বস্তিদায়ক ব্যবধানে হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটিতে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অসফের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে।
এমনকি ট্রাম্প নিজেও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ‘ভালো কাজ করেছে’।
অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্বল প্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তাদের প্রচারে ভোটারদের প্রকৃত উদ্বেগ ও দৈনন্দিন সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে সমালোচনা করেছেন অনেকে।
৪. ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া
ভোটারদের সবচেয়ে বেশি অসন্তোষের দুটি বিষয়- পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম ও ইরান যুদ্ধ- সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে এসব ইস্যুতে ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে তার দলের প্রার্থীদের ওপরও।
এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা অনুমোদনের হার কমেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে সমর্থন করা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও এ কারণে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানতে ট্রাম্প ভোটারদের বলেছিলেন, তারা যেন কল্পনা করেন ব্যালটে তার নামও রয়েছে। অর্থাৎ প্রার্থীদের পাশাপাশি নিজের জনপ্রিয়তাকেও নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন তিনি।
তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকার পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের আকর্ষণ কমতে শুরু করেছে কি না, নির্বাচনের ফল সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। ভোটারদের ক্ষোভ বাড়তে থাকা অবস্থায় রিপাবলিকানদের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে রাখা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত তা উল্টো ফল দিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিভিন্ন জরিপেও দেখা গিয়েছিল, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ট্রাম্পের। কিন্তু নির্বাচনের আগের সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে দেওয়া শেষ প্রচারমূলক ভাষণে তিনি ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে নিজের পেছনে থাকা রিফ্লেক্টিং পুলের বিতর্কিত সংস্কার প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন।
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে পরিবর্তন
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিল। সেই পরিবর্তন ট্রাম্পকে বড় ব্যবধানে জিততে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রবণতা আবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঘুরেছে বলে মনে হচ্ছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এমন তিনটি কংগ্রেশনাল আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। সংবাদমাধ্যমটির তথ্যবিষয়ক প্রতিবেদক জেফ অ্যাডেলসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বড় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি।
অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষের মধ্যেই ভোটারদের এই মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষ আইসের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
অন্যদিকে, কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনও এখন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অঙ্গরাজ্যটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের অনুপাত বেশি- প্রায় ৩৭ শতাংশ। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্কট কলম জয়ী হলে ১৯৮২ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো ডেমোক্র্যাট মিসিসিপি থেকে সিনেটর নির্বাচিত হবেন।
