ইসরাইলে সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি (৪ বিলিয়ন) ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেবে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দেশটির আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই। গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তহবিল বন্ধের বিষয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার একটি সমঝোতা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই মিত্রদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখবে এবং প্রয়োজনে সহায়তা করবে বলেও জানান ট্রাম্প।
ইসরাইলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে বেশ বড় ঘটনা বলেই মনে হয়। তবে এই সহায়তা কীভাবে বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার বিদ্যমান সামরিক সহায়তা চুক্তির মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, ইসরাইলকে সহায়তা দেয়ার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি ‘বাজে রাজনৈতিক হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনি মিশিগান থেকে নির্বাচিত নতুন ডেমোক্র্যাট সিনেটর আবদুল এল-সায়েদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ইসরাইল মার্কিন তহবিল ছাড়াই চলার মতো যথেষ্ট সমৃদ্ধ দাবি করে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের যখন এটির প্রয়োজনই নেই, তখন এল-সায়েদের মতো উন্মাদদের আক্রমণ আমরা কেন সহ্য করব?’
গাজা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই মন্তব্য এল। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রথম যখন এই প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন এই হার ছিল যথাক্রমে ১৬ শতাংশ ও ২০ শতাংশ। এমনকি ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
ফলে নির্বাচনের দিন এমন ঘোষণার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত রিপাবলিকানদের আক্রমণ করার মতো একটি ইস্যু ডেমোক্র্যাটদের হাত থেকে কেড়ে নিতেই এই কৌশল নেয়া হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু নিজেই এই সহায়তা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছেন। যদিও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এর আগে হঠাৎ সহায়তা বন্ধ না করে এক দশক ধরে ধাপে ধাপে তা কমিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। এছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ইসরাইলের জন্য নতুন কোনো সহায়তা পাস করানো এমনিতেই কঠিন হবে।
রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা পেয়েছে ইসরাইল। বর্তমান সহায়তা ব্যবস্থাটি চালু রয়েছে ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায়। এতে ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে মোট ৩ হাজার ৮০০ কোটি (৩৮ বিলিয়ন) ডলারের সামরিক সহায়তার বিধান রাখা হয়েছে।
এর আওতায় ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং (এফএমএফ) বা বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন হিসেবে বছরে ৩৩০ কোটি ডলার এবং যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য ৫০ কোটি ডলারসহ মোট ৩৮০ কোটি ডলার দেয়া হয়। এই কাঠামোর বাইরেও অতিরিক্ত সহায়তা দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলে হামাসের হামলা ও পরবর্তী যুদ্ধের পর।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অর্থ সরাসরি নগদ হিসেবে দেয়া হয় না। এফএমএফের শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন অর্থায়ন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম, সেবা ও প্রশিক্ষণ কিনতে হয় ইসরাইলকে। ফলে এই ব্যবস্থায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও লাভবান হয়।
মার্কিন সহায়তা যে সব সময় নিশ্চিত বলে ধরে নেয়া যায় না, তা নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দ্য ইকোনমিস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আগামী এক দশকে তিনি মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে চান। মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকার কারণে গাজায় রক্তপাত অব্যাহত রাখলে বা পুনরায় ক্ষমতায় এলে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মতামতের কাছে নেতানিয়াহুকে নতিস্বীকারের ঝুঁকিতে থাকতে হয়।
কিন্তু হঠাৎ সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইসরাইলের বিরোধী নেতারা এরই মধ্যে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ট্রাম্পের মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের বিশেষ সম্পর্ক আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার একটি মূল উপাদান। কৌশলগত সম্পর্কের কাঠামোয় এমন পরিবর্তনের খবর নিরাপত্তা বাহিনী ও ইসরাইলের নাগরিকদের সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে হচ্ছে। এটিই প্রমাণ করে যে বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর আচরণ কতটা প্রকৃত বিপদ ডেকে আনছে। আমরা তার ওপর আর নির্ভর করতে পারি না এবং তাকে অবশ্যই সরাতে হবে।’
দ্য ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলানও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ঠিক যে মুহূর্তে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যয় বিশাল আকার ধারণ করেছে, যখন ইসরাইলের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূর্ণ করা প্রয়োজন এবং দীর্ঘ যুদ্ধের পর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে—ঠিক তখনই নেতানিয়াহু তার ব্যর্থতার তালিকায় আরেকটি বিশাল ব্যর্থতা যোগ করলেন। মার্কিন সহায়তা বন্ধ হওয়া ইসরাইলের নিরাপত্তা ও দেশের মানুষের জীবনমানের ওপর একটি চরম আঘাত।’
ফলে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করতে যখন হিমশিম খাচ্ছেন নেতানিয়াহু, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এই মন্তব্য তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। কারণ, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই ছিল নেতানিয়াহুর প্রচারের অন্যতম বড় হাতিয়ার।
কেবল একটি ঘোষণা দিয়েই ট্রাম্প তা করতে পারবেন না। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে এবং প্রতিবছর এই তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসই মূল ভূমিকা পালন করে।
ফলে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা কমিয়ে আনা এবং এর বিপরীতে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অস্ত্র উৎপাদনে যৌথ সহযোগিতা আরও গভীর করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে ইসরাইল নিজেই আরও বড় ও উন্নত বোমা তৈরির কৌশল শিখে ফেলুক—যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই একটি পক্ষ তা ভালো ধারণা বলে মনে করছে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
