ফের ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ-ধর্মঘট
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আবারও রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। বিভিন্ন শহরে পতাকা হাতে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা, ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন সরকারি কর্মীরা।
ফের বিক্ষোভ শুরু হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে এই আন্দোলন তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বামপন্থি শ্রমিক সংগঠন সিজিটি-সহ কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোরও সমর্থন রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি পরিষেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এর আগে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় নাগরিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।
সিজিটির প্রধান সোফি বেনে এলসিআই টেলিভিশনকে বলেন, আজ রাজপথে আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, ফ্রান্সের ২৬০টি শহর ও নগরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে প্যারিসে ফরাসি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্য বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা রাস্তায় ময়লার পাত্র রেখে যান চলাচল আটকে দেন।
সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই ও লিওঁ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় নঁতে শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজধানী প্যারিসে মূল সমাবেশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল স্থানীয় সময় দুপুর ২টা। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কথা ছিল।
লিওঁতে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের কয়েকজনের হাতে ছিল মুখ ঢাকার মাস্ক ও সুরক্ষাচশমা। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁরা এসব সরঞ্জাম সঙ্গে রেখেছিলেন।
নিরাপত্তায় ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন
গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। সেদিন ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট ও সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংকট মোকাবিলায় ম্যাক্রোঁর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা বাড়ে। এরপর থেকে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন বিক্ষোভে পাঁচ লাখ থেকে সাত লাখ মানুষ অংশ নিতে পারেন।
ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। তবে পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা যায়নি।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, পাশে শিক্ষক-কর্মীরা
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোর অবনতিশীল পরিবেশ ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা তাদের বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
লিওঁর একটি বিক্ষোভের জন্য তৈরি ব্যানারে লেখা ছিল, উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শ্রমিক- সবাই একসঙ্গে। ঐক্যই জয়ী হয়।
প্যারিসের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইরমা দ্য বানভিল বলেন, আমরা যতটা সম্ভব আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তবে কিছু মানুষ ভয়ের কারণে অংশ নিচ্ছেন না। পুলিশের সহিংসতা নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভয় রয়েছে।
ফরাসি সরকার পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা হবে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভের আগে বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বিদ্যালয়ের পরিবেশের অবনতি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন তার সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।
ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের লক্ষ্য হলো, উপচে পড়া নদীকে আবার তার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরিয়ে আনা ও যতটা সম্ভব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুরু করা।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সংকটের আগের সময়ের তুলনায় চলতি সপ্তাহে অবরুদ্ধ উচ্চবিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভও মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
তারপরও ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার মান ও সরকারের নীতির বিষয়ে মানুষের অসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছে বিরোধী দলগুলো।
