তারাবি নামাজের জন্য হাফেজ নিয়োগে নির্দেশনা
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ
মুফতি রাশেদুর রহমান

পবিত্র মাহে রমজানের প্রধান অনুষঙ্গ ‘খতমে তারাবিহ’। প্রতি বছরই এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যোগ্য হাফেজের সন্ধান করেন মসজিদ কমিটি।
হাফেজরাও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হাজির হন ইন্টারভ্যুবোর্ডে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এ নিয়োগ প্রক্রিয়াটি শুধু যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। যেখানে প্রার্থীর মেধা যাচাইয়ের আড়ালে অনেক সময় শিষ্টাচার ও আদব লঙ্ঘিত হয়। অথচ ইন্টারভ্যু দিতে আসা এ তরুণ বা কিশোর হাফেজরা চাকরির প্রার্থী নন, তারা আল্লাহর কিতাবের ধারক ও বিশেষ মেহমান। কোরআনের ধারকদের সম্মান করা মূলত আল্লাহকেই সম্মান করার শামিল। তাই হাফেজ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি।
আদব ও শিষ্টাচার : একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় যোগাযোগের মাধ্যমে। যখন কোনো হাফেজ নিয়োগ বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে ফোন করেন, তখন তার সঙ্গে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কথা বলা উচিত। তিনি আমাদের মসজিদে আল্লাহর কালাম শোনানোর আগ্রহ প্রকাশ করছেন- এ বোধটুকু মাথায় রেখে ফোনের উত্তর দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীলরা অত্যন্ত রূঢ়ভাবে কথা বলেন, যা একজন হাফেজের মনে কষ্টের কারণ হতে পারে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, মেহমান বা আগন্তুকের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা।
মেহমানদারি ঈমানি দায়িত্ব : দূর-দূরান্ত থেকে হাফেজরা ইন্টারভ্যু দিতে আসেন। তারা যখন মসজিদে পৌঁছান, তখন দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি তাদের চেহারায় থাকে। ইন্টারভ্যু শুরুর আগে তাদের বসার জন্য নিরিবিলি ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি ইন্টারভ্যু চলাকালে চা-নাশতা বা খাবারের সময় হয়ে যায়, তবে কোনো সংকোচ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। মনে রাখা প্রয়োজন, আমরা মসজিদের খাদেম। খাদেম হিসেবে মসজিদের জন্য হাফেজ সাহেব যেমন খোঁজ করছেন, তেমনি আমরা মসজিদের জন্য আলোকবর্তিকার খোঁজে নেমেছি; যিনি না থাকলে রমজান মাসে মসজিদ থাকবে অন্ধকার। তাছাড়া তিনি আমাদের মেহমানও বটে। মেহমানদারি ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। এতে রিজিকে বরকত আসে।
স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরীক্ষা পদ্ধতি : হাফেজ নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা আমানত। এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, আঞ্চলিকতা বা ব্যক্তিগত সুপারিশের স্থান থাকা উচিত নয়। যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ না দিয়ে সুপারিশের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ দেওয়া আমানতের খেয়ানত। হাফেজ নির্বাচনের জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য বিচারক বা বিজ্ঞ আলেমকে দায়িত্ব দিতে হবে। কারণ, সাধারণ মানুষ শুধু ‘সুর’ দেখে মুগ্ধ হয়, কিন্তু হিফজের মান, মদণ্ডমাখরাজ এবং তাজবিদ বোঝার কারিগরি জ্ঞান সবার থাকে না। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি- নিয়োগ বোর্ডে বাইরের কোনো বড় আলেমকে বিচারক হিসেবে আনলে যেন মসজিদের বর্তমান ইমাম বা খতিব সাহেবকে অবজ্ঞা করা না হয়। অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় ইমাম সাহেবকে পাশ কাটিয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা তার মর্যাদাহানি করে। ইমাম সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে তার মতামতের গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বয়মূলক বোর্ড গঠন করা উচিত।
মেধার মূল্যায়ন ও আমলের কদর : তারাবির ইন্টারভ্যুগুলোতে দেখা যায়, যার কণ্ঠ যত মধুর তাকেই আগে নির্বাচন করা হয়। কিন্তু তারাবির নামাজে ‘ইয়াদ’ বা মুখস্থের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত নামাজ পড়ানো বা লহরি তোলার চেয়ে সহিহ তেলাওয়াত প্রাধান্য পাওয়া উচিত। পাশাপাশি ওই হাফেজ সাহেবের নামাজ ও ইমামতির প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে গভীরতা কতটুকু, সেটিও যাচাই করা দরকার। কারণ, শুধু মুখস্থ থাকলেই নামাজ শুদ্ধ হয় না, নামাজের ভেতরের বিধিবিধান ও সুন্নত পালনে তিনি কতটা অভিজ্ঞ, তা দেখা একান্ত প্রয়োজন।
বিচারকের মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত : ইন্টারভ্যু বোর্ডের জন্য যে আলেম বা কারি সাহেবকে বিচারক হিসেবে আনা হবে, তার সময় ও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যাতায়াত খরচসহ সম্মানজনক হাদিয়া প্রদান করা মসজিদ কমিটির দায়িত্ব। পাশাপাশি বিচারক যখন মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্ত করবেন, তখন কমিটি যেন তার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজস্ব কাউকে চাপিয়ে না দেন, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। বিচারকের সিদ্ধান্তের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ ইন্টারভ্যু প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট করে।
সম্মানজনক বিদায় : ইন্টারভ্যু শেষে ১০ জন প্রার্থীর মধ্যে হয়তো মাত্র দুজন নির্বাচিত হবেন। বাকি ৮ জন হাফেজ সাহেব যেন মন খারাপ করে ফিরে না যান। তারা সময় ও অর্থ ব্যয় করে মসজিদ কমিটির আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। ফিরে যাওয়ার সময় অন্তত তাদের যাতায়াত খরচ ও সামান্য হাদিয়া দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এটি তাদের প্রতি কমিটির কদরের বহিঃপ্রকাশ। অনির্বাচিত হাফেজদের এমনভাবে সান্ত¦না ও বিদায় জানানো চাই, যেন তারা নিজেকে খাটো বোধ না করেন। তাদের তেলাওয়াতের প্রশংসা করতে হবে। দোয়া চেয়ে হাসিমুখে বিদায় দিতে হবে।
