জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

  মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ

একটি বিরোধের জের ধরে বনি ইসরাইলের যুগের অত্যাচারী শাসক বাইতুল মুকাদ্দাসে আক্রমণ করে এবং ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে, নারী ও শিশুকে বন্দি করে নিয়ে যায়। গ্রামের পর গ্রাম লুটপাট করে ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে। অনেক দিন পর সে জনপদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন হজরত উজাইর (আ)। তিনি তাওরাত মুখস্থ করেছিলেন। বাইতুল মুকাদ্দাসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় হঠাৎ এমন ভূতুড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী দেখে বিস্মিত হন। তিনি বলে ওঠেন- আল্লাহ এভাবে মানুষের কঙ্কাল ও ভবনের ইট-সুরকি পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে এখানে কোনো শহর ছিল না, কোনো মানুষ বসবাস করত না। মানুষ কীভাবে মৃতদের জীবিত করবেন? এমন কৌতূহল তাকে ভাবিত করে। আল্লাহ তাকে বোঝানোর জন্য মৃত্যু দেন। এভাবে তিনিও সেখানে অন্যান্য লাশের সঙ্গে মিশে যান। তার বাহন গাধাও মরে কঙ্কাল হয়ে যায়। তবে খাবার ও পানীয় আগের মতোই বহাল রাখা হয়। একশ বছর পর তাকে আবার জীবিত করা হয় (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৫২৭)। এ ঘটনা কোরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘তুমি কি সে লোককে (উজাইর) দেখনি, যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল যার বাড়িঘরগুলো বিধ্বস্ত হয়ে ছাদের ওপর বিরান পড়ে ছিল? সে বলল, এভাবে মরে পড়ে থাকার পর কীভাবে আল্লাহ তাদের জীবিত করবেন?

তখন আল্লাহ তাকে মৃত্যু দিয়ে একশ বছর ফেলে রাখলেন। তারপর তাকে পুনরায় জীবিত করে বললেন, কতোকাল এভাবে ছিলে? সে বলল, এক দিন কিংবা এক দিনের কিছু কম সময় ছিলাম। তিনি বললেন, তা নয়; বরং তুমি তো একশ বছর ছিলে। এবার তাকিয়ে দেখো তোমার খাবার ও পানীয়ের দিকে, সেগুলো পচে যায়নি। তাকিয়ে দেখো তোমার গাধাটির দিকে; আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি। আর হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখো, আমি এগুলোকে কেমন করে জুড়ে দিই এবং সেগুলোর ওপর মাংসের আবরণ পরিয়ে দিই। অতঃপর যখন তার ওপর এ অবস্থা প্রকাশিত হলো, তখন বলে উঠল- আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল।’ (সুরা বাকারা : ২৫৯)।

আল্লাহ যেভাবে মৃতকে জীবিত করবেন : ইবরাহিম (আ)-এর বন্ধ্যা স্ত্রী সারাহ যখন ইসহাককে জন্ম দিলেন, তখন তার ঈমান আরও বৃদ্ধি পেল এবং মৃতকে কীভাবে আল্লাহ পরকালে জীবিত করবেন, তা প্রত্যক্ষ করার কৌতূহল জাগল। আল্লাহ বললেন, এমন আকাঙ্ক্ষার কারণ কী? আল্লাহর শক্তির প্রতি কি আস্থা নেই? ইবরাহিম (আ.) বললেন, অবশ্যই পূর্ণ আস্থা আছে; কিন্তু চোখে দেখে মনে তৃপ্তি পেতে চাই। যেন পুনরুত্থান দিবসে সবাই পুনর্জীবিত হয়ে কীভাবে হাশরের মাঠে সমবেত হবে সেটি অবলোকন করতে পারি। আল্লাহ তাঁর মনের বাসনা কবুল করলেন এবং বাস্তবায়নের জন্য চারটি পাখি লালন-পালন করতে বললেন, যেন সেগুলো এমনভাবে পোষ মেনে যায়- ডাক দিলেই চলে আসে, তিনিও তাদের পুরোপুরি চিনতে পারেন। তারপর সেগুলো জবাই করে হাড়-মাংস টুকরো টুকরো করে চারটি ভাগ চারটি পাহাড়ে রেখে আসতে বললেন। আল্লাহর আদেশে তিনি নিকটস্থ সিনাই পর্বতের চারটি পাহাড়ের চূড়ায় চারটি ভাগ রেখে এলেন। চার পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকায় দাঁড়িয়ে পাখিগুলোর নাম ধরে ডাকলেন। দেখা গেল সব পাখির হাড়ের সঙ্গে হাড়, পাখার সঙ্গে পাখা, মাংসের সঙ্গে মাংস, রক্তের সঙ্গে রক্ত সব মিলেমিশে আগের রূপ ধারণ করল এবং আগের রূপে জীবিত হয়ে দৌড়ে চলে এলো; যেভাবে তিনি লালন-পালনের সময় ডাকলে চলে আসত। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যখন ইবরাহিম বলল, হে আমার পালনকর্তা আমাকে দেখান, কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন। তিনি বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করো না? সে বলল, অবশ্যই বিশ্বাস করি, কিন্তু আমি দেখতে চাইছি এ জন্য, যেন আমি অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। তিনি বললেন, তা হলে তুমি চারটি পাখি ধরে আনো। সেগুলোকে নিজের পোষ মানিয়ে নাও, অতঃপর সেগুলোর দেহের একেকটি অংশ বিভিন্ন পাহাড়ের ওপর রেখে আসো। তারপর সেগুলোকে ডাকো, দেখবে তোমার কাছে তারা দৌড়ে চলে আসবে। আর জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, অতি জ্ঞানসম্পন্ন’ (সুরা বাকারা : ২৬০)।

এতে চোখের সামনে ফুটে উঠল, আল্লাহ কীভাবে মৃতকে সম্পূর্ণরূপে জীবিত করেন। কেয়ামতের দিন সব মানুষের শরীর-অস্থি-মজ্জা পুনরায় গঠিত হবে এবং পুনরায় জীবিত হবে। যেভাবে প্রথমবার জন্ম হয়েছে।