কাবিননামা পূরণে ভুলের কারণ ও প্রতিকার
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২০ | অনলাইন সংস্করণ
মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

কাবিননামা পূরণে সাধারণত তিন কারণে ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে। যথা-
জানার অভাব : অনেকে বিয়েতে কাবিননামা পূরণের বিষয়টিকে একটা গতানুগতিক প্রথা বলে মনে করে। এর গুরুত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। এজন্য কাজীরা যেভাবেই কাবিনের ফরম পূরণ করুক না কেন, পাত্র বা পাত্রপক্ষ উক্ত ফরমটি একটু পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করে না; বরং কাজী সাহেব বরের সামনে ফরমটি পেশ করে স্বাক্ষর করতে বললে বর তাতে সম্পূর্ণ মুখস্থভাবে না পড়েই স্বাক্ষর করে দেয়। পরে কোনো সমস্যা হলে মুফতি সাহেবদের কাছে গিয়ে বলে, ‘আমি তো না জেনেই স্বাক্ষর করেছি। আমি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অনুমতি দিইনি।’ তখন এ জটিলতা সৃষ্টি হয় যে, স্বাক্ষর থাকার কারণে দেশীয় আদালত স্ত্রী কর্তৃক ডিভোর্সকে বৈধ বলে। কিন্তু স্বামীর অনুমতি প্রদানের বিষয়টি স্বীকার না করার কারণে মুফতি সাহেবগণ ডিভোর্স ও অন্যত্র বিয়েকে অবৈধ বলে ফতোয়া দেন কিংবা এ ব্যাপারে বিড়ম্বনায় পড়ে যান।
স্বভাবজাত লজ্জা ও সংকোচবোধ : সমাজ প্রথায়ও বিয়ের মজলিসে পাত্রের কথা বলাকে দোষের বিষয় মনে করা হয়। ফলে কাজীরা কাবিননামায় পাত্রের মতের বিপরীত কোনো কথা লিখলেও সে তার প্রতিবাদ করে না এবং তা সংশোধন করতেও বলে না।
কাজীর গৎবাঁধা ভাষ্য তৈরি : অনেক কাজী কাবিননামার কলামগুলো পূরণের জন্য নিজে থেকে একটা গৎবাঁধা ভাষ্য তৈরি করে নেয়।
বিশেষ করে, ১৮নং কলামটি পূরণের ক্ষেত্রে তো কেউ কেউ নির্দিষ্ট বাক্য সম্বলিত সিলমোহরও বানিয়ে নেয়। এরপর ঢালাওভাবে সব কাবিননামায় ওই গৎবাঁধা ভাষ্যই ব্যবহার করে। বরপক্ষ ও কনেপক্ষ কারোরই অনুমতির প্রয়োজন মনে করে না। উল্টো কোনো বর বা বরপক্ষ/উভয় পক্ষ যদি এর বিপরীতে তার/তাদের নিজের/নিজেদের দেওয়া কোনো কথা লিখতে বলে, তখন কাজীরা তা লিখতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে, ‘এভাবে লেখা নিয়ম না।
আমি এভাবে লিখতে পারব না। অন্যান্য কাবিনে যা লিখি, আমাকে তা-ই লিখতে হবে।’ আবার অনেক সময় মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষকে কোনো শর্ত লিখতে দেয় না। বলে, ‘সরকারি যা আইন আছে, কাজী সাহেব তা-ই লিখবেন। আপনারা নিজেরা কেন শর্ত লিখবেন?’ অনেক মূর্খ বা এ ধারার বিষয়ে অজ্ঞ কনেপক্ষ তো এ নিয়ে বিয়ে অনুষ্ঠানে ঝগড়া-ঝাটি ও তুলকালাম আরম্ভ করে দেয়। অথচ কাজীদের ও কনেপক্ষের উক্ত কথা সম্পূর্ণ ভুল।
কাবিননামার ধারাগুলো বিশেষত ১৮নং ধারাটি দেওয়াই হয়েছে বর ও কনের তথা উভয় পক্ষের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের মতো করে লেখার জন্য, কাজীদের ইচ্ছা অনুযায়ী লেখার জন্য নয়।
কারণ, কাবিননামার নিয়মটি বিধিবদ্ধ হয়েছে বর ও কনের স্বার্থ রক্ষার জন্য। সুতরাং তারা কী লিখবে এবং কীভাবে লিখবে- এ ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা যা লিখলে এবং যেভাবে লিখলে নিজেদের স্বার্থের পক্ষে অনুকূল হবে বলে মনে করবে, তারা তা-ই লিখতে পারবে। এতে কাজীদের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। এ ক্ষেত্রে সবার জন্য একই কথা বা একই ভাষ্য ব্যবহার করার কোনো নিয়ম বা বিধান সংবিধানে নেই। এগুলো সব কাজীদের মনগড়া নিয়ম। যদি সংবিধানে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ্য কোনো কথা নির্ধারিত থাকত, তাহলে সেটি ফরমে ছাপানোই থাকত। সেক্ষেত্রে ‘কিনা?’ ও ‘কী কী?’ এ জাতীয় স্বাধীনতাসূচক শব্দ লেখা থাকত না।
জরুরি পরামর্শ : কাবিননামা সঠিকভাবে পূরণের মধ্যে যেহেতু বর ও কনের ভবিষ্যত জীবনের বহু সুবিধা-অসুবিধার বিষয় নিহিত রয়েছে, তাই সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে এটি পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে, ১৭ ও ১৮নং কলামদুটি ভালো করে দেখে এবং ভেবে-চিন্তে পূরণ করা জরুরি।
আর বিয়ের মজলিসে যেহেতু ১৮নং ধারার বিষয়বস্তু তথা ‘স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান প্রক্রিয়া’ নিয়ে সবিস্তারে কথা বলা যায় না বা বিয়ের মুহূর্তে তালাকের বিষয়ে কথাবার্তা বলাকে অনেকে পছন্দও করে না, তাই মজলিসের আগেই পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে নেওয়া উচিত। এরপর সেই ভিত্তিতে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর কাজীকে দিয়ে কাবিননামা পূরণ করিয়ে নেওয়া চাই। তবে কখনও যদি কাজী নিজ থেকে আগেই কাবিননামার ফরমটি পূরণ করে ফেলে, তাহলে সেটি ভালোভাবে পড়ে দেখতে হবে। যদি অসঙ্গত কোনো কথা লেখা থাকে, তাহলে তা কেটে দিয়ে বা সংশোধন করে স্বাক্ষর করা চাই। এ ক্ষেত্রে লজ্জা বা সংকোচ করা ঠিক হবে না।
১৮নং ধারা পূরণের সঠিক পদ্ধতি : স্ত্রী যেন পরকীয়া বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িয়ে অন্যায়ভাবে তালাক ও ডিভোর্স গ্রহণ করতে না পারে কিংবা নিজের ওপর তালাক প্রয়োগে তাড়াহুড়ো না করে ভেবে-চিন্তে তালাক গ্রহণ করতে পারে এবং পরে যেন তাকে আফসোস করতে না হয়, সেজন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাষায় ধারাটি পূরণ করা উচিত। যেন প্রয়োজন ছাড়া সামান্য রাগ হলেই স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে না পারে। আবার স্বামীও যেন স্ত্রীকে আটকে রেখে জুলুমণ্ডনির্যাতন না করতে পারে। উক্ত বিবেচনায় ধারাটি পূরণের সময় এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি-
(ক) সর্বোচ্চ এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা।
(খ) উক্ত ক্ষমতার বাস্তবায়নে উভয় পক্ষের অন্তত একজন বা দুজন অভিভাবকের অনুমতিসাপেক্ষে হওয়ার শর্তারোপ করা।
(গ) তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণটি সুচিন্তিত শর্তসাপেক্ষে হওয়া, প্রচলিত হালকা ও গৎবাঁধা শর্তে না হওয়া।
(ঘ) কাবিননামার সব ধারা বিশেষত ১৮নং ধারাটি পূরণ করার পরেই বরের স্বাক্ষর করা।
তালাক গ্রহণের পর্যায় ও পরিস্থিতি : উপরিউক্ত চারটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখেই আলোচ্য ধারাটি পূরণ করা উচিত।
সামনে ১৮নং ধারা পূরণের একটি প্রস্তাবিত নমুনা পেশ করা হচ্ছে। তবে তার আগে তালাক গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায় ও পরিস্থিতিটা একটু উল্লেখ করা দরকার। তা হলো, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিরোধ যদি এ পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা একে অপরের হক কোনোক্রমেই যথাযথভাবে আদায় করতে পারছে না, তাহলে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের নিয়ে প্রথমে সমঝোতা বৈঠক করতে হবে।
এতে যদি উভয়কে মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তো অনেক ভালো। অন্যথায় পাত্রী ও পাত্রপক্ষের এক বা একাধিক অভিভাবক যদি তাদের একত্রে অবস্থানের চেয়ে পৃথক হয়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করেন, তবে তখন (স্বামী না চাইলেও) স্ত্রী নিজ নফসের ওপর ১৮নং ধারা বলে শুধু এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করবে।
১৮নং ধারা পূরণের প্রস্তাবিত নমুনা : সংক্ষেপে ধারাটি এভাবে লেখা যেতে পারে, ‘হ্যাঁ, যদি উভয় পক্ষের কমপক্ষে একজন বা দুজন করে অভিভাবক শরিয়তসম্মত গ্রহণযোগ্য কারণে বিচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হন বা সম্মতি প্রদান করেন, তাহলে স্ত্রী অভিভাবকদের লিখিত অনুমতি নিয়ে এক তালাকে বায়েনা গ্রহণ করতে পারবে।’ আশা করা যায়, এভাবে লিখলে মাসআলাগত কোনো জটিলতায় পড়তে হবে না, ইনশাআল্লাহ। উল্লেখ্য, স্ত্রী কর্তৃক তালাক গ্রহণের ব্যাপারে অভিভাবকের অনুমতি লিখিত হওয়ার শর্ত করা হয়েছে পরবর্তীতে ফতোয়া বা রায় পেতে ঝামেলা না হওয়ার জন্য। আর উভয় পক্ষের অভিভাবকের অনুমতির শর্ত করা হয়েছে কনে বা কনেপক্ষ ঠুনকো কারণে অন্যায়ভাবে যেন তালাক বা ডিভোর্স গ্রহণ করে ছেলের ওপর জুলুম করতে না পারে। উপরিউক্ত নিয়মে ধারাটি পূর্ণ করলে তালাক গ্রহণে তাড়াহুড়ো হবে না।
শুধু এক তালাকে বায়েন গ্রহণের কারণে পরবর্তীতে পুনরায় একসঙ্গে থাকার সুযোগও বাকি থাকবে। স্ত্রী অন্যায়ভাবে বা মিথ্যা অজুহাতে তালাক গ্রহণ করতে পারবে না। অতএব, এ ব্যাপারে সকলেরই সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে যারা বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন বা বিয়ে পড়ান, তাদের সচেতন হওয়া খুবই দরকার। তাদের অসচেতনতার কারণে অনেক সংসার অল্পতেই ভেঙে যেতে পারে।
