সিয়াম সাধনায় পালনীয় নির্দেশনা
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৮ | অনলাইন সংস্করণ
শায়খ সালাহ বিন মুহাম্মদ আল বুদায়ের

পবিত্র মাস রমজান। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য এ মাসে সিয়াম পালন করা ফরজ। শরিয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট বৈধ সমস্যার কারণে আল্লাহ রোজা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এটি বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া এ বিধানের ওপর আমল করতে চায়, তার জন্য রোজার কাজা কীভাবে আদায় করতে হয়, সে ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান থাকা জরুরি। যেন সে পরিপূর্ণ জ্ঞানের মাধ্যমে নিজের ওপর বর্তানো আবশ্যকীয় বিধানগুলো ঠিকমতো আদায় করতে পারে। পুরোপুরি বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের জিম্মাদারি থেকে মুক্ত হতে পারে। রমজান মাস আসার আগেই এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা এবং সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত ভালো কাজ। যেন রমজানের চাঁদ ওঠার আগেই পূর্বের রমজানের কৃত কাজা রোজাগুলো আদায় করে নেওয়া যায়।
কাজা রোজা পালন করাও ফরজ : যার রমজানের রোজা ছুটে যায়, তার জন্য সেই রোজাগুলোর কাজা আদায় করা আবশ্যক। কেননা, কাজা আদায় করা বিধানগত মূল রোজা আদায়ের মতো। অর্থাৎ কারও যদি রমজানের ফরজ রোজা ছুটে যায়, তাহলে তার জন্য কাজা আদায় করাও ফরজ। রাসুল (স.) উম্মে হানি (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘যদি রমজানের রোজা ছুটে যায়, তাহলে এক রোজার পরিবর্তে রমজান পরবর্তী সময়ে একটি কাজা রোজা আদায় করো।’ আর নফল রোজার কাজা ঐচ্ছিক। চাইলে কাজা আদায় করা যায়, আবার চাইলে না করলেও সমস্যা নেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। আর যে অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূর্ণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান। তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না। যেন তোমাদের হেদায়াতের কারণে তোমরা গণনা পূর্ণ করো। আল্লাহর মহত্ব বর্ণনা করো। যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। রমজান পরবর্তী সময়ে ছুটে যাওয়া রমজানের রোজা এ জন্য রাখতে বলা হয়েছে, যেন কাজা আদায়ের মাধ্যমে পূর্ণ মাস রোজা আদায় হয়। অর্থাৎ রমজানে যতদিন রোজা ছুটে গেছে, পরে ঠিক ততদিন কাজা আদায়ের মাধ্যমে তা পূরণ করে নিতে হবে।
নওমুসলিমের রোজার বিধান : যদি কোনো ব্যক্তি কুফর থেকে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তার জন্য কাফের থাকা অবস্থায় ছুটে যাওয়া রোজা রাখতে হবে না। কেননা, ইসলাম কবুল করার আগ পর্যন্ত সে যত গোনাহ করেছে, আল্লাহতায়ালা ইসলাম কবুল করার কারণে তা মাফ করে দিয়েছেন। কেননা, এটা আল্লাহর হক। তা ছাড়া ছুটে যাওয়া রোজা আদায় আবশ্যক করা হলে মানুষ ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত। কোনো অমুসলিম যদি রমজান মাসে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে ইসলাম গ্রহণের পরবর্তী দিনগুলোতে সে রোজা রাখবে। ছুটে যাওয়া রোজাগুলো তাকে রাখতে হবে না। আর যেদিন ইসলাম গ্রহণ করবে, সেদিনের বাকি অংশ অর্থাৎ সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্যান্য রোজাদারের মতো পানাহার ও যৌন সঙ্গম থেকে বিরত থাকবে। রমজানের পরে এ দিনগুলোর কাজা আদায় করবে।
মুরতাদের রোজার বিধান : কোনো ব্যক্তি যদি রমজানের রোজার আবশ্যকীয়তা অস্বীকার করে, তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। কেননা, সে ইসলামের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অস্বীকার করেছে, যা কোরআন-হাদিস দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত। মুরতাদ যদি আবার ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে মুরতাদ অবস্থায় যেই রোজা ছুটে গেছে, তার কাজা আদায় করতে হবে না। কোনো ব্যক্তি যদি রোজার আবশ্যকীয়তা স্বীকার করে এবং শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার পরও রোজা পালন না করে, তাহলে সে কাফের হবে না। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর অবাধ্য হওয়ায় কবিরা গোনাহ হবে। ওলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী এমন ব্যক্তির জন্য রোজা ছেড়ে দেওয়ার অপরাধে তওবা করতে হবে। ছুটে যাওয়া রোজার কাজা আদায় করা ওয়াজিব হবে। সুতরাং কেউ যদি রোজা ছেড়ে দেয়, তাহলে অবশ্যই পরবর্তীতে তার জন্য কাজা আদায়ের মাধ্যমে রোজা পূর্ণ করতে হবে।
যে দিনগুলোতে রোজার কাজা করা যাবে না : দুই ঈদের দুই দিন এবং আইয়্যামে তাশরিক তথা ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ রমজানের রোজার কাজা আদায় করা জায়েজ নেই। কেউ যদি এ দিনসমূহে রোজা রাখে, তাহলে তার রোজা আদায় হবে না। বরং বাতিল বলে গণ্য হবে। ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী তার জন্য দ্বিতীয়বার আবার কাজা আদায় করা আবশ্যক।
ফরজ নাকি নফলের কাজা আগে করতে হবে : কারও যদি ফরজ রোজা অথবা রমজানের রোজা বাকি থাকে, তাহলে তার জন্য নফল রোজা রাখার আগে ফরজের কাজা আদায় করা জরুরি। তবে কেউ যদি ফরজ রোজার কাজা আদায় করার আগেই নফল রোজা আদায় করে, তাহলে তার নফল রোজা আদায় হয়ে যাবে। কেননা, ফরজ এবং নফল রোজা আদায়ের জন্য তার যথেষ্ট সময় বাকি আছে।
যখন রোজার কাজা আবশ্যক নয় : কোনো ব্যক্তি যদি শরিয়া কর্তৃক বৈধ কারণে পুরো রমজান অথবা রমজানের কিছু রোজা ছেড়ে দেয়, তাহলেও রমজান পরবর্তী সময়ে তার জন্য ছেড়ে দেওয়া রোজার কাজা আদায় করা ওয়াজিব। তার ওপর কোনো কাফফারা আবশ্যক হবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। রোজার সময় মেয়েদের হায়েজ তথা ঋতুস্রাব হলে এ ব্যাপারে মুয়াজ (রা.) বলেন, আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মেয়েরা ঋতুস্রাবের সময় ছুটে যাওয়া রোজার কাজা আদায় করে, কিন্তু সালাতের কাজা আদায় করে না কেন?’ আয়েশা (রা.) বলেন, ‘এ অবস্থায় রোজার কাজা আদায়ের জন্য আমাদের আদেশ করা হতো, নামাজের কাজা আদায়ের জন্য আদেশ করা হতো না।’ (মুসলিম : ৩৩৫)।
কাজা রোজা কখন পালন করতে হবে : ছুটে যাওয়া ফরজ রোজার কাজা সুযোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক। তবে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী দেরি করে আদায় করার অনুমতিও আছে। তবে শর্ত হলো, পরবর্তী রমজান আসার আগেই কাজা রোজা আদায় করে ফেলবে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর সময়ে আমাদের মধ্য থেকে যখন কোনো মেয়েলোক রোজা ছেড়ে দিত, তখন তাদের এর কাজা আদায় করতে করতে শাবান মাস চলে আসত।’ (মুসলিম : ১১৪৬)। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজা রোজা আদায় করা মুস্তাহাব। কেননা, আবশ্যকীয় কাজে দেরি না করে দ্রুত করে ফেলা উত্তম। কারণ, মানুষ জানে না, তার ভবিষ্যতে হয়তো কোনো ধরনের সমস্যা অথবা সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে, যা কাজা রোজা আদায়ের জন্য প্রতিবন্ধক। ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী রমজানের রোজার কাজা আদায়ের জন্য ছুটে যাওয়া সব রোজা ধারাবাহিকভাবে রাখাটা জরুরি নয়। কেউ চাইলে ধারাবাহিকভাবে রাখতে পারবে, আবার আলাদা আলাদা করেও কাজা আদায় করতে পারবে।
কোন রোজার নিয়ত কখন জরুরি : ফরজ রোজা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য রাতে নিয়ত করা শর্ত। আর নফল রোজা দিনে নিয়ত করলেও আদায় হয়ে যাবে। কাজা রোজার জন্য রাতের মধ্যেই নিয়ত করতে হবে। রাতে নিয়ত না করে থাকলে দিনে নিয়ত করার মাধ্যমে কাজা রোজা আদায় হবে না। অর্থাৎ সুবহে সাদিকের আগেই কাজা রোজার নিয়ত করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ফজরের আগে নিয়ত না করলে রোজা শুদ্ধ হবে না।’ (সুনানে নাসাঈ : ২৩৩১)।
কাজা রোজা রেখে ভেঙে ফেলার বিধান : কাজা রোজা রেখে কোনো শরঈ কারণ ছাড়াই ভেঙে ফেলা জায়েজ নেই। কেননা, রমজানের রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্যের মতোই কাজা রোজার গুরুত্ব। কেউ যদি জেনে বুঝে কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই কাজা রোজা রেখে ভেঙে ফেলে, তাহলে তার জন্য তওবা করা আবশ্যক। অন্য দিন ওই রোজা আবার রাখাও আবশ্যক।
একসঙ্গে নফল ও কাজা রোজার নিয়ত করা যাবে : জিলহজ মাসের প্রথম দশক, সোমবার ও বৃহস্পতিবার রমজানের রোজার কাজা আদায় করা জায়েজ। তবে ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মত হলো, একই নিয়তে রমজানের কাজা রোজা এবং নফল রোজা একত্রিত করা যাবে না। কাজা ও নফল রোজার একসঙ্গে নিয়ত করলে নফলও আদায় হবে না। জিলহজের প্রথম দশক, মুহাররমের ৯ ও ১০, সোমবার, বৃহস্পতিবারের রোজার নিয়ত ছাড়া আলাদা করে রমজানের রোজার কাজা আদায়ের নিয়ত করা জরুরি। দুই ধরনের রোজার নিয়ত একসঙ্গে হতে পারে না। হয়তো শুধু নফল রোজার নিয়ত করবে, নয়তো শুধু কাজা রোজার নিয়ত করবে। যদি কেউ কাজা রোজা আদায়ের নিয়ত করে, তাহলে তার নফল রোজা আদায়ের ফজিলত অর্জন হবে না। কেননা, এর কোনো প্রমাণ শরিয়তে নেই। যে দিনগুলোতে শরিয়ত আমাদের নফল রোজা আদায় করতে বলেছে, সে দিনগুলো নফল আদায় করা, আর অন্য দিনগুলোতে কাজা আদায় করা বেশি উত্তম। কেননা, তখন নফল রোজা আদায়ের ফজিলত অর্জন হবে, আবার কাজা রোজার ফরজও আদায় হয়ে যাবে।
এক রমজানের কাজা রোজা পালনে অন্য রমজান পর্যন্ত দেরি করা : ওলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী কোনো বৈধ কারণ ছাড়া এক রমজানের কাজা রোজা পালনে অন্য রমজান পর্যন্ত দেরি করা জায়েজ নেই। যে এক রমজানের কাজা রোজা অন্য রমজান পর্যন্ত দেরি করে, তার দুই অবস্থা তৈরি হয়- প্রথমত অসুস্থতা অথবা সফরের জন্য রোজা কাজা করেছে। পরবর্তী রমজান পর্যন্ত তার অসুস্থতা অথবা সফর অব্যাহত ছিল। এমতাবস্থায় সে আসন্ন রমজানের রোজা আদায় করবে। রমজান পরবর্তী সময়ে পেছনের রমজানের কাজা রোজা আদায় করবে। দ্বিতীয়ত কেউ যদি কাজা রোজা আদায়ের জন্য সুযোগ পেয়েও অলসতা এবং বিনা কারণে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত দেরি করে, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য সবার মতানুযায়ী কাজার সঙ্গে কাফফারা আবশ্যক হয়ে যায়।
কাফফারা কী : কাফফারা হচ্ছে, একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে। প্রত্যেক এমন কাজা রোজা, যার জন্য কোনো কারণ ছাড়াই পরবর্তী রমজান পর্যন্ত দেরি করেছে, তার জন্য আলাদা আলাদা কাফফারা আবশ্যক হবে। এটা ওলামায়ে কেরামের দুটি মতের একটি। এ মতটিই বিশুদ্ধ। সাহাবায়ে কেরামও এ মত দিয়েছেন।
কাফফারার পরিমাণ কতটুকু : কাফফারার পরিমাণ হলো- গম, চাল, খেজুর অথবা প্রচলিত খাবারের আধা হিসসা, যা বর্তমানে দেড় কিলোগ্রাম সমপরিমাণ হয়। এ কাফফারা কাজা রোজা আদায় করার আগেও দেওয়া যাবে, পরে দেওয়াও জায়েজ আছে। তবে আগে দিয়ে দেওয়া উত্তম। কেউ যদি কাফফারা আদায়ে অসামর্থ্যবান হয়, তাহলে যখন তার অবস্থার উন্নতি হবে অথবা সামর্থ্যবান হবে, তখন আদায় করে দিতে হবে।
