রমজান সংস্কৃতি দেশে দেশে
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ
মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

সৌদি আরব : রমজান মাস পালনে সৌদিতে মাস দুয়েক আগ থেকে প্রস্তুতি চলে। ইবাদতের জন্য সারাদিনের কাজকর্ম গুটিয়ে আনেন সৌদিরা। পরস্পর সাক্ষাৎকালে ‘শাহরু আলাইকা মোবারাকা’ বলে কুশল বিনিময় করে। রমজান শুরু হওয়ার সপ্তাহ-দশ দিন আগ থেকেই সৌদিতে রাস্তার পাশে কিংবা বাজার-মার্কেটে শোভা পায় সারি সারি তাঁবু। যার অনেকগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
রোজাদারদের ইফতার করানোর জন্যই তৈরি করা হয় এসব। তাঁবুগুলোতে যথারীতি ভালো মানের ইফতারির ব্যবস্থা করা হয়। তাঁবুর ইফতার আয়োজনে সাধারণত খেজুর, বোতলজাত পানি, জুস, মাঠা, ফল, কফি, চিকেন বিরিয়ানি এবং এলাকাভিত্তিক ঘরোয়া খাবার থাকে। পুরো রমজান মাসে ভিনদেশি শ্রমিকদের ইফতার বা সেহরি কখনও কিনতে হয় না। এসব কাজ তাঁবুতে পুরোপুরি নিজস্ব উদ্যোগেই হয়ে থাকে। রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন কোম্পানির জিনিসে থাকে বিশেষ ছাড়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য থাকে হাতের নাগালে। সরকারিভাবে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্রয়-অক্ষম মানুষদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় গিফট বক্স। যাতে থাকে তেল, চিনি, দুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্য।
আরব আমিরাত : রমজান শুরুর আগেই আমিরাতে রমজান উদযাপনের ধুম পড়ে যায়। বেশ উল্লাসের সঙ্গে পালিত হয় ‘হক আল লায়লা’। শাবানের ১৫ তারিখে আসন্ন রমজানকে উদযাপন করতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায় দেশটির হালচিত্র। বন্ধ থাকে নাইট ক্লাব, বার। প্রকাশ্যে পানাহার ও ধূমপান, দণ্ডনীয় অপরাধ। বছরজুড়ে সড়কগুলো পরিচ্ছন্ন থাকলেও এ সময় হয় আরও ঝকঝকে। জমকালো আলোক সজ্জায় সাজে উপসাগরীয় দেশটি। দুবাইয়ে রমজান শুরুর ঘোষণা দেয় দি ইউনাইটেড আরব আমিরাত মুন সাইটিং কমিটি। আরব বিশ্বের ইউরোপ হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজানের চাঁদ দেখার পর একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু হয় রোজা। ইফতার ও সেহরি শুরু হয় কামান দাগিয়ে। আমিরাতের ইফতারে থাকে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাব। ইফতারের প্রধান মেন্যুতে থাকে ঐতিহ্যবাহী থারিদ, বিরিয়ানি, কাতায়েফ, সালাদ, ইতালিয়ান পাস্তা, ফল। তবে নবীজি (সা.)-এর প্রিয় অ্যারাবিয়ান ডিশ- রুটিতে ছড়ানো মাংসের ‘হারিস’ তাদের ভীষণ পছন্দ। মহিমান্বিত এ মাসে রোজাদারদের প্রতি দেশটির জনগণের আতিথেয়তা মুগ্ধ করার মতো।
ফিলিস্তিন : নতুন চাঁদ দেখা দিলে ফিলিস্তিনি শিশুরা রঙিন বেলুন ও ফানুস নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। বাহারি ফানুসে বর্ণিল হয় ফিলিস্তিনের আকাশ। রমজানের মধ্যরাতে জেরুসালেমে ছেলে-মেয়েরা মিলে ড্রাম বাজিয়ে ঘুম থেকে মানুষকে সেহরি খেতে জাগায়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। সেহরির সময় দল বেঁধে এমন মধুর চিৎকারে মনে হয়, যেন জান্নাতি পাখিরা ডাকছেন। মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এ প্রথা এখনও চালু রয়েছে। জেরুসালেমে কামান ছুঁড়ে ও আতশবাজি ফুটিয়ে ইফতারের সময় জানানো হয়। রমজানে বিশেষ বিশেষ খাবার তৈরি করতে পছন্দ করে ফিলিস্তিনিরা। বিশেষ অনেক খাবার রয়েছে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে অন্যদের তুলনায় বিশেষ ধরনের পদ পছন্দ করা হয়। গাজায় সাধারণত মাকলুবা, সুমাগিয়াহ ও মাফতউল খায়। পশ্চিম তীরে মুসাখান ও মনসাফ বিখ্যাত। আচার ও সালাদ সবসময় ফিলিস্তিনি ইফতারের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। এখানকার ইফতারির সঙ্গে বাংলাদেশের বেশ মিল রয়েছে। পুরনো জেরুসালেমের বাসিন্দারা চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী তাদের জনপ্রিয় পানীয় তামারিন জুস পান করে। তবে সাধারণত তাদের ইফতার প্রথমে খেজুর দিয়ে শুরু হয়। পনির ও দই জাতীয় খাবার ইত্যাদি সেহরিতে খায়।
কানাডা : কানাডায় মসজিদে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসলিমরা রোজা ভাঙার জন্য একত্রিত হন। এ সময় একটি চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মিলনমেলায় পরিণত হন তারা। রমজানজুড়ে বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করেন। কমিউনিটির অন্যান্যদের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করেন। প্রায় প্রতিটি মহাদেশের খাবারের স্বাদ নিতে পারেন মুসলিমরা। এর মধ্যে যেমন রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাদের বিরিয়ানি, তেমন রয়েছে ইথিওপিয়ান ইনজেরা বা ইউক্রেনিয়ান পেরোজিও। রমজানে কানাডার মুসলিম পরিবারগুলো বাচ্চাদের বিশেষ স্মৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। তারা রমজানের বিভিন্ন খাবারের আয়োজনসহ ধর্মীয় নানা বিষয় শিক্ষা দেন। যাতে শিশুরা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। রমজান মাসে রোজা রাখা গোটা বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান হলেও কানাডিয়ান এক অমুসলিম সংসদ সংদস্য ছয় বছর ধরে রোজা রাখছেন। উদ্দেশ্য একটাই, অভাবী মানুষকে খাওয়ানো। কানাডিয়ান গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওর আজাক্স শহরে বসবাসরত ওই সংসদ সদস্যের নাম মার্ক হল্যান্ড। রোজা রাখার কারণে তার খাবারের টাকা তিনি দান করেন ‘গিভ ৩০’ নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-অস্ট্রেলিয়ার গরিব মানুষদের ‘খাবারের ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে এ দেশগুলোর অভাবী মানুষকে খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।
মিশর : রমজান মাসে মিশরের রাস্তা, দোকান, বাড়ির ছাদ- বাতির আলোয় সর্বত্র ছেয়ে যায়। এ মাসের মহিমা যেন পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে আলো হয়ে। দেশটিতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে ইফতার পালনের সংস্কৃতি আছে।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। আজকাল মিশরীয় তরুণরা ক্যাফে ও রেস্তোরাঁতেই ইফতার করতে অভ্যস্ত হচ্ছে। তারাবির নামাজকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ সংস্কৃতি রয়েছে দেশটিতে। ইফতারের পরপরই দল বেঁধে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তারাবির জন্য রওনা হন মিশরীয় যুবকরা। বাংলাদেশে যেমন মসজিদে সাইরেন বাজানোর মাধ্যমে সেহরি ও ইফতারের সময় জানানো হয়; মিশরীয়রা এ ক্ষেত্রে কামানের গোলার শব্দকে অনুসরণ করে। দেশটিতে মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়েরও উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মানুষ রয়েছে। রমজান মাসে রোজার সম্মানে তারাও প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকেন। অনেক খ্রিষ্টানও সারাদিন উপবাস থেকে রোজার পবিত্রতা রক্ষা করেন।
তুরস্ক : মিশরের মতো একদল মানুষ সেহরির সময় জাগিয়ে তোলেন তুর্কিদের। কিন্তু শুধু গান গেয়ে বা উঁচু গলায় ডেকে নয়, তারা রাস্তায় নামেন ঢোল-দামামা বাজিয়ে।
ঢোলের শব্দে জেগে ওঠে পুরো ইস্তাম্বুল। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এ রীতির পেছনের বিশ্বাস হলো, সেহরিতে মুসলমানদের জাগিয়ে দেওয়া অন্য মুসলমানের জন্য সওয়াব ও সৌভাগ্য বয়ে আনে। সেহরি ও ইফতারের সময় তুরস্কেও কামানের গোলার আওয়াজ শোনা যায়।
দিনের বেলায় রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান বন্ধ থাকে। দুপুরের পর থেকে চলতে থাকে ইফতারের আয়োজন। সেহরির সময় রেস্তোরাঁগুলো খোলা রাখা হয়। দেশটিতে সেহরি ও ইফতারের সময় অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষদেরও মুসলমানদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রেখে যোগ দিতে দেখা যায়। রমজান মাসে সরকারি অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা বা সময় পরিবর্তনের কোনো আয়োজন নেই। অফিস-আদালত ঠিক রেখে তারা ইফতারের আগে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেন। খেজুরের পরিবর্তে জলপাই দিয়ে তুর্কিরা রোজা ভাঙেন।
মালয়েশিয়া : মাহে রমজানকে ঘিরে মালয়েশিয়ায় থাকে বিশেষ আয়োজন। বেশ অতিথিপরায়ণ হয়ে ওঠেন মালয়েশিয়ানরা। মসজিদগুলোতে বিনামূল্যে ইফতারির সুযোগ থাকে। বিনামূল্যে শরবত ও বুবুর বা নরম খিচুড়ি দেওয়া হয়। চাল, মাংস, নারকেলের দুধ, ঘি ইত্যাদি দিয়ে বুবুর ল্যাম্ব্যাক তৈরি করা হয়। প্রায় পাঁচ দশক যাবত কুয়ালালামপুর কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে খাবারটি বিতরণের প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিনামূল্যে ইফতারের ব্যবস্থার কোনো কমতি নেই মালয়েশিয়ায়। ধনী-গরিব সবাই একসঙ্গে বসে এ ইফতার করেন। মালয়েশিয়ায় স্থানীয়রা বিভিন্ন প্রকারের হাতে বানানো পিঠা, হালুয়া জাতীয় নাশতা, সাদা ভাত, ফলমূলসহ মালয়েশিয়ান খাবার দিয়ে ইফতার করেন। সঙ্গে থাকে আম, তরমুজ, বাঙ্গি, কলা, পেঁপে, আপেল, আঙুর, কমলাসহ নানা রকমের মালয়েশিয়ান ফল। রমজানে মুসলমানদের দিনে প্রকাশ্যে খাওয়া মালয়েশিয়ার আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রতি বছর এ অপরাধে আটক হন অনেকে। এ ছাড়া পুরো রমজানে সরকারি নজরদারিতে জিনিসপত্রের দাম অন্যান্য সময়ের থেকে কম রাখা হয়। ক্রেতাদের জন্য আকর্ষণীয় ছাড় ঘোষণা করে শপিংমলগুলো।
জার্মান : ১৯ ঘণ্টা রোজা রাখেন জার্মানের মুসলমানরা। রাত তিনটায় সেহরি খেয়ে পরদিন রাত দশটায় ইফতার করেন তারা। অন্যদিকে জার্মানের মুসলমানদের চেয়ে পাঁচ মিনিট কম অর্থাৎ ১৮ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট রোজা রাখেন ইংল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। দেশটির বেশির ভাগ মুসলমান ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত। তাই এত দীর্ঘ সময় রোজা রাখা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। এখানে প্রায় ৪০ লাখ মুসলমান। যাদের বেশির ভাগ শ্রমিক। তারা বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে এসেছেন। বর্তমানে এ দেশে দু’হাজার মসজিদ আছে। শীত মৌসুমে এখানে সূর্য ওঠে সকাল ৮টায়; ডোবে বিকেল ৪টায়। তাই কাজের মধ্যেই ইফতারির সময় হয়ে যায়। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমান শ্রমিকদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। জার্মানে মসজিদের পাশাপাশি রয়েছে প্রচুর ইসলামিক সেন্টার ও নামাজের স্থান। এসব ইসলামিক সেন্টারের পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। আয়োজন করা হয় ইফতার পার্টিরও। এখানকার রোজাদাররা ইউরোপের অন্যান্য দেশের মুসলমানদের মতো ইফতার করে থাকেন। আমাদের দেশের মতো ইফতারে বাহুল্য বিলাস তাদের পছন্দ নয়।
ইন্দোনেশিয়া : রমজান শুরুর দুই সপ্তাহ আগ থেকে সেমারাং শহরের বাসিন্দারা একটি উৎসব পালন করে থাকেন। তারা রং-বেরঙের পোশাক পরেন। শোভাযাত্রায় অংশ নেন। পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ‘মিউগানা’। রমজান মাস শুরুর একদিন আগে সুদানিসির নৃগোষ্ঠী পালন করে ‘মুংগাহান’। মুংগাহানের উৎপত্তি ‘উনগাহ’ থেকে। অর্থ- সামনের দিকে এগিয়ে চলা। রোজাদার যেন আগের বারের চেয়ে আরও বেশি সংযমের সঙ্গে এবারের রোজা পালন করতে পারেন, এ উদ্দেশেই ‘মুংগাহান’ উৎসব পালন করা হয়। বিভিন্নভাবে ‘মুংগাহান’ পালন করা হয়। যেমন- পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়া, প্রতিবেশিদের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করা। অর্থাৎ এমন কিছু করা, যেখানে পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় ইফতারকে বলা হয় ‘বুকা’। যার অর্থ- শুরু করা। ইফতার আয়োজনে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো ‘আবহাম’ নামের পানীয় ও খেজুর। খেজুরের সঙ্গে ‘কোলাক’ নামে এক প্রকার মিষ্টান্নও পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া তারা রাতের খাবারে ভাত, সবজি, মুরগি ও গরুর গোশত খেতে পছন্দ করে। তবে সেহরিতে খাবার খায় খুবই সামান্য। দেশটির সুরাবায়া শহরে রমজানের শুরুতে ‘আপেম’ নামীয় একটি খাবার না হলে চলেই না। রমজানে তাদের প্রতিদিনকার খাবার এটি। তবে খাবারের চেয়ে এর উদ্দেশ্যটা বেশি চমৎকার। ধারণা করা হয়, আপেমের উদ্ভব আরবি ‘আফওয়ান’ শব্দ থেকে। যার অর্থ ‘দুঃখিত’। খাবারটিকে ‘ক্ষমা’র প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
ইরান : রমজান এলে ইরানের অনেক লোক তাদের দোকান বা গলি আলো ও ফুল দিয়ে সাজায়। লোকেরা একে অপরকে ‘রমজান মোবারক’ বলে অভিনন্দন জানায়। প্রাচীনকালে সময় নির্ধারণ ও সেহরির রীতিনীতির আরেকটি মাধ্যম মোরগের ডাক। ইরানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন বিশ্বাস করত, মোরগ রাতের দীর্ঘ পরিসরে তিনবার ডাক দেয়। এ কারণেই নিজেদের বাড়িতে মোরগ রাখা কল্যাণ ও বরকতের প্রতীক মনে করত। সেহরিতে তারা সাধারণত হালকা খাবার হয়। যা আগে তৈরি করা থাকে। তবে ইফতারে বাহারি খাবারের আয়োজন করে। সম্ভব হলে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইফতার করে থাকে। মসজিদে কিংবা আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে ইফতারি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে ইরানে। রমজান মাসে ইরানের মসজিদে খাবার ও ইফতার বিতরণ করা হয়। তাতে মিষ্টি, তাজা খেজুর, ঐতিহ্যবাহী আজারি পনিরসহ শাক-সবজি ও বাদাম থাকে। যদিও ইফতারের জন্য নির্দিষ্ট খাবার নেই, তবু ইরানিদের কিছু অনন্য রান্না রয়েছে; যা বছরের অন্যান্য মাসে পাওয়া যায় না। সুস্বাদু সিরায় গভীর ভাজা ময়দার তৈরি জুলবিয়া বামিহ, হালিম, ঐতিহ্যবাহী অ্যাশ রেশতেহ, শাকসবজি, ভাজা পেঁয়াজ, মাংস, বাদাম, মটরশুটি, পার্সিয়ান নুডলস এবং অন্য অনেক কিছুর ভারী মিশেল থাকে। হালিম নামে একটি খাবারও ইফতারিতে খাওয়া হয়। তবে এ হালিমের স্বাদ বাংলাদেশের হালিমের মতো নয়। ছোট চাল, চিনি আর জাফরান দিয়ে রান্না করা হয় এক ধরনের ক্ষির বা পায়েশ; যার ইরানি নাম ‘শোলে জার্দ’।
ইরাক : রমজানে ইরাকের ঐতিহ্য হলো, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া। এ সময় তারা পরস্পরকে ধর্মীয় বইপত্র উপহার দেয়। পরিবারপ্রধান শিশু সদস্যদের কোরআন শরিফ উপহার দেন। ইরাকিরা যথাসম্ভব বিয়েগুলো রমজান মাসে সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। অন্যান্য দিক থেকে আধুনিকতার ছোঁয়া পেলেও তারা ইফতারের ব্যাপারে এখনও পুরনো ঐতিহ্যের অনুসরণ করে থাকেন। ইফতার আয়োজনে থাকে প্রথমত তাজা বা শুকনো খেজুর; সঙ্গে শিনেনা বা টক দই দিয়ে তৈরি করা বিশেষ শরবত। এর সঙ্গে থাকে মসুর ডালের স্যুপ। থাকে সিদ্ধ চালের ভাত এবং ভেড়া অথবা মুরগির মাংস। সেই সঙ্গে থাকে শরবত। মিষ্টান্ন হিসেবে থাকে মাহাল্লাবি বা দুধের তৈরি পুডিং। তারা খোলা ছাদে বা বাড়ির সামনে খোলা প্রাঙ্গণে বসে ইফতার করতে পছন্দ করে। সেহরির সময় অল্প আহার করলেও ইফতারে থাকে নানা আয়োজন। বেশির ভাগ ইরাকি গরু, মহিষ বা ছাগলের দুধ পান করে রোজা ভাঙে। এরপর তারা বসরার খেজুর খান। সঙ্গে থাকে বিশেষ ধরনের শরবত; যা তারা ইফতার-সেহরি উভয় সময়ই পান করে থাকেন।
ফিলিপাইন : ফিলিপাইনের মুসলিমরা রমজানকে ধর্মীয় অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে। রমজান তাদের মধ্যে রীতিমতো উৎসবের সৃষ্টি করে। রমজানের শুরুতেই তারা মসজিদগুলোর সৌন্দর্য বর্ধনে আলোকসজ্জাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। মসজিদগুলো পরিণত হয় সামাজিক মিলনকেন্দ্রে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ইবাদত ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পরিবারের পুরুষসদস্য ও শিশুরা মসজিদে একত্রিত হয়। রমজান মাসে প্রতিটি মসজিদে মাসব্যাপী ধর্মীয় পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়। মুসলিম পুরুষরা বেশির ভাগ সময় মসজিদে ইবাদতে কাটান। শিশুরা ধর্মীয় পাঠ নিতে মনোযোগী হয়।
রমজানে ফিলিপাইনের মুসলমানরা সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সমাজের অসহায়-দুস্থ মানুষের কল্যাণে তারা বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নেন। যেমন- সামাজিকভাবেই ধনীরা গরিবদের ইফতার ও সেহরির ব্যবস্থা করেন। জাকাত-ফেতরার সব টাকা মসজিদে জমা করা হয়। ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে তা দুস্থ মানুষের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। রমজান মাসে তাদের খাবারেও বৈচিত্র্য রয়েছে। ইফতারের টেবিলে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো ‘কারি কারি’ নামক ভুনা গোশত। এ ছাড়া মিষ্টান্ন, শরবত ও হরেক রকম ফল থাকে ইফতার আয়োজনে। ইফতারের পর ফিলিপাইন শিশুরা ভালো পোশাকাদি পরে রাস্তায় বের হয়। মেতে ওঠে উৎসবে।
জর্দান : জর্দানের অধিবাসীরা একটু ভিন্নরকম রমজান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা করে। জর্দানের জগদ্বিখ্যাত রমজান-সংস্কৃতির একটি হলো, গোশতের শরবত। দেশি গম ও গোশত দিয়ে তৈরি করা হয় এ শরবত। রমজানে হরেক রকম কফিও তৈরি হয় সেখানে। অতিথিদের বিভিন্ন রঙের কয়েক প্রকার কফি পরিবেশন করা জর্দানি সংস্কৃতির অংশ। মসজিদে ইফতারের সাধারণ আয়োজনেও থাকে গরম কফি। শুধু খাদ্য-খাবারের ঐতিহ্য নয়, ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া-জিকির ও দান-আতিথেয়তায়ও আছে জর্দানবাসীর নিজস্ব ঐতিহ্য। আনন্দ-উল্লাসে রমজানকে আপন করে নেন তারা। রমজান মাসে প্রচুর দান করেন তারা। বিশেষত খেজুরসহ অন্যান্য ইফতারসামগ্রী গরিবদের মধ্যে বিতরণ করেন। প্রতিটি মসজিদেই ইফতারের আয়োজন করা তাদের সংস্কৃতির অন্যতম দিক। বাড়িতে মসজিদের জন্য দানবাক্স থাকে। একজন ব্যবস্থাপক সে অর্থ সংগ্রহ করেন।
