
ঈমানদার মানুষের যে গুণগুলো সবচেয়ে উত্তম ও যে বৈশিষ্ট্যগুলো সবচেয়ে সুন্দর তার মধ্যে রয়েছে- সূক্ষ্ম অনুভূতি, জাগ্রত চেতনা, জীবন্ত হৃদয় ও এমন বোধসম্পন্ন জ্ঞান যা মানুষকে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার সম্মান করতে, যা তিনি মহান করেছেন তার মর্যাদা দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে তার মধ্যে সত্যিকারের ঈমান, দৃঢ় বিশ্বাস ও অবিচল আত্মসমর্পণের স্পষ্ট প্রমাণ প্রকাশ পায়। আর আল্লাহ তাঁর রহমত ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সময় ও স্থানগুলোর মধ্য থেকে যেগুলোকে ইচ্ছা বিশেষ মর্যাদা দান করেন। তিনি সেখানে এমন কিছু ইবাদত ও নৈকট্যের কাজ নির্ধারণ করেন, যার মাধ্যমে বিনয়ী ও অনুগত বান্দারা তাঁর নিকটবর্তী হয়। তারা এসব আমলের মাধ্যমে তাদের রবের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে উত্তম আগমন ও সৌভাগ্যময় উপস্থিতি কামনা করে।
হারাম মাসগুলো আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়ের অন্যতম : আল্লাহতায়ালা যেসব বিষয় হারাম করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে ‘হারাম মাসগুলো’।
এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস বারোটি; তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।’ (সুরা তাওবা : ৩৬)।
এ মাসগুলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবু বাকরা (রা.) থেকে জানা যায়, বিদায় হজের খুতবায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় সময় তার আসল অবস্থায় ফিরে এসেছে, যেদিন আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। বছর বারো মাসের, এর মধ্যে চারটি হারাম মাস। তিনটি ধারাবাহিক- জিলকদ, জিলহজ ও মহররম; আর চতুর্থটি রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শাবানের মধ্যখানে।’ (বোখারি : ৪৬৬২)।
শরিয়তে মাসগুলোর সংখ্যা ও হারাম মাসগুলোর বিধান বহাল : নববি বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহর রাসুল (সা.) মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধানকে পুনরায় নিশ্চিত করেছেন, যেখানে কোনো আগানো-পেছানো ও বাড়ানো-কমানো নেই। অর্থাৎ শরিয়তের দৃষ্টিতে মাসগুলোর সংখ্যা ও হারাম মাসগুলোর বিধান আজও ঠিক সেভাবেই আছে, যেভাবে আল্লাহ তা সৃষ্টিলগ্নেই নির্ধারণ করেছেন। এর মাধ্যমে জাহেলি যুগের সেই প্রথা বাতিল করা হয়েছে, যেখানে তারা হারাম মাসকে পরিবর্তন করত।
কখনও তা পিছিয়ে দিত, কখনও হালাল মাসকে হারাম বানাত! এ প্রথাকে বলা হয় ‘নসি’। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এই যে মাসকে পিছিয়ে দেওয়া শুধু কুফরি বৃদ্ধি করা, যা দিয়ে কাফেরদের বিভ্রান্ত করা হয়। তারা একে কোনো বছর বৈধ করে এবং কোনো বছর অবৈধ করে, যাতে তারা আল্লাহ যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে; অনন্তর আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করতে পারে। তাদের মন্দ কাজগুলো তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে সৎপথ দেখান না।’ (সুরা তাওবা : ৩৭)। এটি ছিল জাহেলি যুগের বিকৃতি, পরিবর্তন ও ধর্ম নিয়ে খেলা করার একটি উদাহরণ, যা তাদের বিভ্রান্তি, কুফরি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের আয়াত অস্বীকারের প্রমাণ।
হারাম মাসগুলোর মর্যাদা অনুভব করার বড় লক্ষণ : হারাম মাসগুলোর মর্যাদা অনুভব করার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো, এ মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ গোনাহ করা, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া ও যেকোনো ধরনের পাপে নিজেকে কলুষিত করা থেকে সাবধান থাকা। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা তাওবা : ৩৬)। প্রত্যেক সময়েই গোনাহ করা খারাপ, অশুভ ও নিজের ওপর জুলুম। কারণ, এটি মহাপরাক্রমশালী ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী আল্লাহর অবাধ্যতা। অথচ তিনিই অসংখ্য মহান নেয়ামত ও অনুগ্রহ দানকারী। কিন্তু হারাম মাসে গোনাহ আরও বেশি খারাপ, আরও বেশি অশুভ এবং আরও বড় জুলুম। কারণ, এতে একদিকে আল্লাহর অবাধ্যতা ও অন্যদিকে তাঁর নির্ধারিত পবিত্রতার অবমাননা একত্রিত হয়। যেমন- পবিত্র শহর মক্কায় গোনাহের শাস্তি বেশি কঠোর হয়। কারণ, আল্লাহ বলেন, ‘যে ইচ্ছা করে সীমালঙ্ঘন করে, তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তুদ শাস্তি।’ (সুরা হজ : ২৫)।
হারাম মাসে গোনাহ বেশি গুরুতর : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহ মাসগুলোর মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন, সেগুলোকে হারাম করেছেন ও তাদের পবিত্রতাকে বড় করেছেন। এসব মাসে গোনাহকে আরও গুরুতর করেছেন, আর সৎকাজ ও তার প্রতিদানকেও আরও বড় করেছেন।’ কাতাদা (রহ.) বলেছেন, ‘হারাম মাসগুলোতে জুলুম করা অন্য সময়ের তুলনায় বেশি বড় পাপ ও ভারী গোনাহ। যদিও সব অবস্থাতেই জুলুম বড় অপরাধ, কিন্তু আল্লাহ যেটা ইচ্ছা সেটাকেই বিশেষভাবে বড় করে দেন।’
যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দীন হিসেবে ও বিশ্বনবী (সা.)-কে রাসুল হিসেবে মেনে সন্তুষ্ট, তার উচিত নিজেকে গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখা, পাপের পথে পতন থেকে দূরে রাখা ও নিজেকে পাপের ময়লা থেকে পবিত্র রাখা। তার উচিত খেয়াল-খুশির অনুসরণ, ক্ষণিকের কামনা-বাসনা, ধ্বংসকারী প্রবৃত্তি, শয়তানের প্ররোচনা ও খারাপ কাজে প্ররোচিতকারী নফসের সাজানো ধোঁকা থেকে নিজেকে উঁচুতে রাখা এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা ও পদাঙ্ক থেকে দূরে থাকা।
জীবন একেকটি ধাপ ও যাত্রার মতো : সবসময় স্মরণ রাখা উচিত, এ জীবন একেকটি ধাপ ও যাত্রার মতো। এতে জীবনকাল শেষ হয়ে যায়, নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে যায়, আর আমল করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
মানুষ জানে না- কখন তাকে এ জীবন থেকে বিদায় নিতে হবে, কতদূর পর্যন্ত সে এগোতে পারবে কিংবা জীবনের পথে কোথায় এসে থামতে হবে। সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার মন উচ্চ মর্যাদা অর্জনের দিকে ধাবিত হয়। যে আল্লাহর সন্তুষ্টি, ভালোবাসা ও ক্ষমার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে চায় সে অতীতের ঘাটতি পূরণ করে এবং অবশিষ্ট সম্মানিত সময়গুলো ও বরকতময় মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগায়। সে সঠিক পথ ও সঠিক পন্থা অবলম্বন করে এ হারাম মাসে ও সারা বছরজুড়েই। মহান আল্লাহ সত্যই বলেছেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।’ (সুরা হাশর : ১৮)।
আনুগত্য ও ইবাদতের দিকে অগ্রসর হতে হবে : আগের যুগের নেককার কিছু মানুষ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে কিছু জিনিসকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন। ফেরেশতাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে দূত বানিয়েছেন, মানুষের মধ্য থেকেও রাসুল নির্বাচন করেছেন। কথার মধ্যে তাঁর জিকিরকে নির্বাচন করেছেন। পৃথিবীর মধ্যে মসজিদগুলোকে নির্বাচন করেছেন। মাসগুলোর মধ্যে রমজান ও হারাম মাসগুলোকে নির্বাচন করেছেন।
দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনকে নির্বাচন করেছেন। রাতগুলোর মধ্যে লাইলাতুল কদরকে নির্বাচন করেছেন। অতএব, তোমরা আল্লাহ যা মহান করেছেন তাকে মহান মনে কর।
কারণ, জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানদের কাছে কোনো বিষয় তখনই মর্যাদা পায়, যখন আল্লাহ তাকে মর্যাদা দেন।’ সুতরাং আল্লাহকে ভয় করতে হবে। তিনি যা মহান করেছেন, তাকে মহান মনে করা চাই। এর মধ্যে এ হারাম মাসও অন্তর্ভুক্ত।
এর পবিত্রতা অনুভব করতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ এ মাসগুলোসহ সব সময়েই নিজেদের ওপর জুলুম করা থেকে সাবধান থাকা চাই। আনুগত্য ও ইবাদতের দিকে অগ্রসর হতে হবে, নৈকট্য অর্জনের আমলগুলোতে নিজেকে নিয়োজিত করা চাই। আল্লাহর রাসুল (সা.) থেকে সহিহভাবে যা প্রমাণিত হয়েছে তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে এমন সব নবসৃষ্ট বিদআত থেকে দূরে থাকা চাই, যার কোনো ভিত্তি আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহে নেই। সফল সেই ব্যক্তি, যে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও মহানবী (সা.)-এর অনুসরণে আল্লাহ যা মহান করেছেন তাকে মহান মনে করে ও যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে।