সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে শালীন পোশাকের গুরুত্ব

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

  মুফতি হায়াত মাহমূদ জাকির

সমাজ মানুষের সম্মিলিত জীবনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। একটি সুস্থ, সুন্দর ও নৈতিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য মানুষের আচার-আচরণ, মূল্যবোধ ও জীবনধারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জীবনধারার একটি মৌলিক অংশ হলো পোশাক-পরিচ্ছদ। শালীন পোশাক শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকেই উন্নত করে না, বরং একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

প্রথমত, শালীন পোশাক মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করে। পোশাক মানুষের রুচি, চরিত্র ও মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যখন একজন ব্যক্তি শালীনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, তখন তা অন্যদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে এটি বিশেষ সহায়ক।

ইসলাম ধর্মে শালীন পোশাকের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চিনে নেওয়া সহজ হবে এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না।’ (সুরা আহজাব : ৫৯)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শালীন পোশাক নারীর মর্যাদা রক্ষা করে এবং সমাজে তাকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করে।

এছাড়াও কোরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুর নুর : ৩০)। এর পরবর্তী আয়াতে নারীদের জন্যও অনুরূপ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, শালীনতা শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দৃষ্টি, আচরণ ও চরিত্রের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

হাদিসেও শালীনতার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি অংশ।’ (বোখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শালীনতা ও লজ্জাশীলতা একজন মুমিনের মৌলিক গুণ, যা সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক।

বর্তমান সমাজে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, অশালীন পোশাক ও অসংযত আচরণের কারণে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন- উত্ত্যক্ততা, সামাজিক অস্থিরতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। অন্যদিকে, যেখানে মানুষ শালীনতা বজায় রাখে, সেখানে পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট ড্রেস কোড চালু করার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও একটি বাস্তব উদাহরণ হলো পরিবার। যে পরিবারে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শালীন পোশাক ও আচরণের শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই পরিবার থেকে সাধারণত নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে ওঠে। ফলে পুরো সমাজই উপকৃত হয়।

তবে শালীন পোশাকের বিষয়টি শুধু বাহ্যিক নয়, এটি অন্তরেরও বিষয়। শুধু পোশাক পরিবর্তন করলেই সমাজ পরিবর্তন হবে না; এর সঙ্গে মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক শিক্ষারও পরিবর্তন প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরে- পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম- শালীনতা ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য শালীন পোশাক অপরিহার্য উপাদান। এটি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে শালীনতা বজায় রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।