উলামায়ে দেওবন্দের গৌরব ও কীর্তি
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৮ | অনলাইন সংস্করণ
মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

কওমি মাদ্রাসা আলোর মৃত্তিকা আর রোদ্দুরের মিতালি; ঘন কুয়াশায় আশার আলো। জাতির দিকদর্পণে চির উন্নত শিখা। হাজারো শুদ্ধ প্রাণস্পন্দনের সমারোহ। রাতজাগা আউলিয়ায়ে কেরামের সাধনার ফল। কালে পৃথিবীর বুকে যেসব উন্নত ও যুগোপযোগী ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম। সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সা.) যার নির্মাতা। যার অমীয় সুধা পান করে পরশ পাথরে পরিণত হয়েছেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো লাখো সাহাবি (রা.)। শুদ্ধতার পথে হেঁটে হেঁটে বনে গেছেন যার আদর্শ হাজারো সাহাবায়ে কেরাম ও মহামনীষীগণ। আবির্ভূত হয়েছেন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতো বড় বড় ইমাম। যে বলয় থেকে তৈরি হয়েছেন ইবনে আরাবি, ইবনে বতুতা, ইবনে সিনা ও ইমাম গাজালির মতো গবেষক, বিজ্ঞানী ও যুগশ্রেষ্ঠ আলেম। পদধূলিতে যাদের ধন্য হয়েছে গোটা বিশ্ব।
এ সত্যের অভিসারী ও উম্মতের অতন্দ্র প্রহরীরাই মনুষ্যত্বকে ঈমানের বলে বলীয়ান হতে জাগিয়ে তোলেন। মানবতার অলিগলিতে যাদের অবদান চির স্মরণীয়। না খেয়ে না পেয়েও তৃপ্ত থাকার গৌরবগাথা ইতিকথা আছে যাদের সত্যকাহিনির ঝুলিতে। ধমনিতে যাদের ঐশী আহ্বানের সুর বাজে সারাক্ষণ। সাঁঝের বেলায় নীড়হারা পাখির হন্যে হয়ে এদিক-ওদিক খুঁজে ফেরার ব্যর্থ চেষ্টা আর বাসায় ফেরার অন্তিম তাগাদার মতো দিক ও নাবিকহারা জাতির সত্যিকারের আলোর দিশারী এ কওমিপড়–য়া উলামায়ে কেরাম। আলোর স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে যাদের কথায় কথায়। বাকরুদ্ধ হয় না যাদের অপশক্তির কড়াল অসতী হুমকির মুখেও। এ যেন চির সত্য, চির উন্নত, চির সুন্দরের ভাস্বর মিছিল। চপল তারুণ্য যেখানে ভর করে সৃষ্টি-সুখের উচ্ছ্বলতায়। ভালোবাসার অতলে হারিয়ে যেখানে খুঁজে ফেরে মনুষ্যত্বের পাশবিকতাও অধরা সুখ। এ যে অনন্ত, অনন্য, চির ভালোবাসা- আশার ফুল, হৃদয়-সুখের শ্রেষ্ঠ কারখানা।
উপমহাদেশের ইতিহাসের বেড়াজাল ভেদ করলেই অবদান চোখে পড়ে কওমি মাদরাসার, উলামায়ে দেওবন্দের। হিন্দু, বৌদ্ধ, বর্ণবাদী আর নানা অপশক্তির কোন্দলে পড়ে যখন গোটা ভারতবর্ষ শিকার হয়েছিল বাঁচা-মরার দ্বিধা-দ্বন্দ্বে, নিজেদের অস্তিত্ব আর টিকে থাকার লড়াইয়ে, ঠিক সে সময়ে কুখ্যাত সেই ইংরেজ বেনিয়া আর চারদিকের অপশক্তির হাত থেকে দীন-ধর্ম, দেশ-জাতিকে তার মূল আদর্শের ওপর অবিচল রেখেছেন এ উলামায়ে দেওবন্দ। গড়ে তুলেছেন তাদেরই উত্তরসূরিরা বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ। তার অনুকরণেই আজ গড়ে উঠছে হাজার হাজার কওমি মাদরাসা আর কওমি চেতনার সন্তান। প্রতিটা অঞ্চলে যাদের আগমনী সুরে বসন্তের কোকিলও যেন হার মানে। বাকবিতণ্ডায় যাদের কেঁপে ওঠে সব অশুভ শক্তি। দেশপ্রেমিক, নিঃস্বার্থ, জাতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ এ আলেমগণের মহান প্রতিপালকের দরবারে রোনাজারি ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই তৈরি হয়েছে একদল ছাত্রসমাজ। উলামায়ে দেওবন্দ নামেই পৃথিবীজুড়ে যাদের খ্যাতি। ১৯৪৭ সালে যাদের কর্মতৎপরতা, উদ্দমতা আর বুকের তাজা খুনের বিনিময়েই পরাধীনতার শৃঙ্খজাল ভেদ করে উপমহাদেশে উঁকি দিয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য।
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তির সয়লাব আজ চারদিকে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে খেলছে ভোমরা দুষ্টচক্র অপখেলা। এহেন পরিস্থিতিতে প্রতিবছরই উলামায়ে দেওবন্দ জাতিকে উপহার দেন স্বার্থত্যাগী সচেতন একদল কর্মনিষ্ঠ কর্মী; যারা প্রিয় মাতৃভূমিকে সকল অপশক্তির আগ্রাসন থেকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন নিরলসভাবে। স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য রক্ষায় আবর্তিত হন অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায়। যুগোপযোগী জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষাদীক্ষায় জুড়ি নেই এ উলামায়ে দেওবন্দের। বিশ্বের প্রতিটা খাতে, প্রতিটা স্তরে কাজ করে যাচ্ছেন উলামায়ে দেওবন্দ। তাদের কর্মনিষ্ঠতা, সততা, বস্তুনিষ্ঠতা সাফল্যের কড়া নেড়েছে পৃথিবীর সভ্য-সুশীল মহলের দরজায়। আচার-আচরণ, ব্যবহারবিধি, সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব আঞ্জাম যাদের সুনাম-সুখ্যাতির উচ্চশেখরে পৌঁছে দিয়েছে বেশ আগেই। জ্ঞানসাগরের মুক্তামণি তুলে এনে জাতিকে আঁধারের চাদর থেকে আলোর পথযাত্রী করতে তাদের জুড়ি নেই। তাইতো তারাই জন্ম দিয়েছে ইবনে হাজার আসকালানি, বাকিল্লানি, মারগিনানি, ইবনে খালদুন, ফারাবি, আল্লামা রাজি, আল্লামা কুরতুবি ও ইমাম তহাবির মতো ইলমের যুগশ্রেষ্ঠ ধারা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিরব সাধনার চির বহমান স্রোতে যাদের সামনে তুচ্ছ হয়েছে যুগের রাজসিংহাসন। বেলা-অবেলায় আলোকিত করা যাদের ইলমের প্রজ্জ্বোল শিখার প্রতিভাসে রাজমুকুটের হাতছানি এসেছে বারবার। তবু টলে পড়েননি যারা পার্থিব এ সকল ক্ষণস্থায়ী মোহে। এগিয়ে চলেছেন নিজেদের মৌলিক লক্ষ্য-অভিষ্টে।
মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ অনুগত ও আস্থাশীল এ উলামায়ে দেওবন্দ। আর সুন্নতে নববির আলোকিত পথে যাদের অবিরাম অনন্তর পথচলা। কওমির এ শিক্ষাধারা কোনো মানুষের হাতে গড়া নয়, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা এর কারিগর। যার আবেদন এসেছিল ইবরাহিম (আ.)- এর তরফ থেকে। প্রার্থিত সেই শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচি ছিল কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত, মানুষের চরিত্রশুদ্ধি, কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষাদান। মহান রাব্বুল আলামিন কবুল করেছিলেন মুসলিম উম্মাহর পিতার সেই প্রার্থনা। এরই ধারায় মূর্খ বর্বরতার যুগে আলোর দিশা হয়ে এসেছিলেন আমাদের প্রিয়নবী (সা.)। তিলে তিলে যিনি গড়ে তোলেন আদর্শ সমাজ। সমাজ বিনির্মাণে যার সেই আদর্শপন্থা আজকের সমাজসেবী আর সমাজের দর্পক দাবিদারদের কাছে মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে। ধীরে ধীরে সাড়ে চৌদ্দশ বছরের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে সেই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে দেন সাহাবায়ে কেরাম, তাবেইন, তাবে তাবেইন এবং সালফে সালেহিন। সূচনায় যেমন এ শিক্ষাব্যবস্থা উম্মাহর কল্যাণে কাজ করেছে, অদ্যাবধি তা অব্যাহত রয়েছে। তাই বিজ্ঞানের ফোকাস মনিটরের চোখ ঝলসানো আলোয় যারা অজ্ঞান হয়ে এ শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকার অবান্তর অভিযোগের মহড়া তোলেন, তারা মূলত এর হাকিকত সম্বন্ধে বেখবর।
নববি আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে উলামায়ে দেওবন্দের এ শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীরা হন ভদ্র, সভ্য, ন¤্র, বিনয়ী, মানবিক উন্নত চরিত্রাবলির অধিকারী। ফলে ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে পাশ্চাত্ব্যের অন্ধ অনুকরণ করেন না তারা। সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির বেড়াজালে ভাসিয়ে দেন না গা। আকাশ মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়ার নোংরা, বেহায়াপনা, নগ্নতা ও অশ্লীলতায় নিমগ্ন হন না। এরা কালেভদ্রে সর্বদাই ছিলেন সভ্য, সুশীল ও উন্নত চরিত্রের স্বর্ণশেখরে। তাইতো যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে এ শিক্ষাধারা ও শিক্ষার্থীদের জয়জয়কার সোনালি সবুজাভ দিন। আক্ষরিক অর্থে যাকে ঐতিহ্য বলে। ধ্রুপদি দিনগুলো কেবল পেরোয়নি এ মিছিলের, অল্পে তুষ্ট, পরকল্যাণে সচেষ্ট, দেশ ও দশের জন্য উৎসর্গিত প্রাণ, জাতির প্রতি মায়া-মমতা, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার অবারিত এক অনুপম উপমার স্বাক্ষর রেখেছে আজ পর্যন্ত। অভাব-অনটন আর অনাহারে জর্জিত হওয়া সত্ত্বেও উলামায়ে দেওবন্দ লোভ-লালসা, সন্ত্রাস, হানাহানি, খুনোখুনি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির কালো বাজার থেকে সম্পূর্ণ দূরে অবস্থান করেন সর্বদাই। অথচ এ দেশের সর্বোচ্চ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এর কোনো একটি দৃষ্টান্ত পেশ করতেও সক্ষম হয়নি। পার্থিব যশ-খ্যাতি, অর্থসম্পদ, ভোগ-প্রাচুর্যের পেছনে না পড়ে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততার ভিত্তিতেই জীবনযাপন করেন এ মিছিলের প্রতিটা সদস্য। তাই দেশ-জাতির খেয়ানত, খুন-গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতির মহড়া, অর্থকেলেঙ্কারি, ইয়াবা, মদ, ফেন্সিডিলসহ যাবতীয় অন্যায় ও গর্হিত কাজে জড়ান না কওমিপড়–য়া আদর্শবান এ সোনার ছেলেরা।
নানা আঙ্গিকে এরই মধ্যে উলামায়ে দেওবন্দ সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন জাতির সামনে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সদা বিরাজ করে পারস্পরিক কলহ-বিবাদমুক্ত এক অন্তরঙ্গ পরিবেশ। আজ পর্যন্ত এমন কোনো বাজে রেকর্ড নেই এর, যাতে এর সুনাম-সুখ্যাতির গায়ে কিঞ্চিৎও আঁচড় কাটা যায়। দুষিত রাজনীতির পঙ্কিলতা, ছাত্ররাজনীতির বিষাক্ততা নেই এখানে। তাই আজ পর্যন্ত কওমি মাদরাসায় পড়তে এসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অন্য কোনো বিবাদে জড়িয়ে কাউকে প্রতিপক্ষের হাতে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়নি। বিপরীতে দেশের নামি-দামি, উন্নত শিক্ষা ও চরিত্রের নামধারী সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটা যেন নিত্যদিনকার মাছ-ভাতের মতো। যার প্রমাণ মেলে প্রতিদিনকার খবরের কাগজের সচিত্র প্রতিবেদনে।
দিকে দিকে আজ এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। হচ্ছে রকমারি মিলনমেলা সমাজসেবার। কালো চুলগুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মোহনীয় শ্লোগানে। বালিশের তলে মাথা পেতে শুভ্র চুলের মাথাকে কেশহীন করছে পার্থিব তাবৎ বিষয় নিয়ে গবেষণা করে। তবু পায় না সমাজ তাদের থেকে কোনো প্রকৃত বার্তা। কৃত্রিমতায় ভরা ধুয়াশার মোড়ক একদিন ঠিকই উন্মোচিত হয় জাতির সামনে। এ কেবল ক’দিনের মোহনীয় আকর্ষণমাত্র। গবেষণার ওই দ্বার রুদ্ধ হয় সহসাই অন্তিম কোনো আশায়। পায় না পার। এ যে ঠিকানাহীন আশ্রয়। তবু ব্যর্থ চেষ্টা। পক্ষান্তরে উলামায়ে দেওবন্দের প্রতিটা কাজ, চলাফেরা, উন্নত চিন্তা, গবেষণা, জাতির জন্য আশার বাণী। কথায় কাজে আজ পর্যন্ত ব্যর্থ হননি তারা। কারণ, এসব তো কোনো সৃষ্টির জ্ঞানপ্রসূত কোনো বিষয়ে সমাধান হয় না, বরং ঐশীগ্রন্থের আলোকে হয়। সর্বোপরি উলামায়ে দেওবন্দ দেখিয়েছেন সাফল্য, কল্যাণকামিতা আর পরার্থে নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মোদ্দমী মহৎ উদ্দোগ। তাই যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার নামে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, সহশিক্ষা দান করে, আলোর পরিবর্তে ছড়ায় অন্ধকার- আর যা-ই হোক, তারা আলোর ইশকুলের দাবি করতে পারে না। রাশি রাশি আঁধার ছাড়া সমাজ তাদের থেকে পায় না কিছু। তাদের কথায়-কাজে আপাত মোহনীয় স্লোগান একদিন ফিকে কিংবা হারিয়ে যায় সত্য ও ন্যায়ের সামনে। আর আলোকিত এ মিছিলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে আসে রহমত, বরকত, করুণা, দয়া মহামহিম স্রষ্টা রাব্বে কারিমের। ছড়ায় আলো। আশার আলো। জাতির জন্য নিয়ে আসে অমীয় শান্তি-সুখের ধারা। যা শুধুই ওই ঐশী আহ্বানের পথচলায় হয়ে থাকে। তাই এ কওমি মাদরাসা হলো আলোর ইশকুল, বাতিলের মুখোশ উন্মোচক, হৃদয়-অলিন্দে শান্তির ফোয়ারাবাহক, জাতির অতীত-বর্তমান আর আগামীর শুভসংঘের পরম সহযোগী। খোদায়ি মদদে জাতিকে কোলে নিয়ে এ ধারা অব্যাহত থাকুক যুগ যুগ ধওে অবিশ্রান্তভাবে, অবিরাম, নিরলস হয়ে; নিরন্তরের পথে।
