বিধি লঙ্ঘন বাড়ছে, অ্যাকশন কম

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দেশজুড়ে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নির্বাচনি প্রচারণা, পোস্টার-ফেস্টুন ও সহিংসতা ঘিরে আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ উঠছে। তবে এসব লঙ্ঘনের তুলনায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ইসি সূত্র জানায়, প্রথমবারের মতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন। তবে অনেকেই সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেননি। এ পর্যন্ত ইসি এবং রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে কয়েক হাজার আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এলেও ইসি তেমন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে কিছু প্রার্থীকে ইসি শোকজ করলেও প্রার্থীরা তেমন গুরুত্ব দেননি।

এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে মোট ১৪৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এ সময় ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং ৯৪টি মামলা করা হয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে এনসিপি ও জামায়াতের অভিযোগ প্রসঙ্গে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, অভিযোগ নির্বাচন কমিশন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে ইসি। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো নির্বাচনি এলাকায় একক কোনো জনসভায় একইসঙ্গে তিনটির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন না। প্রচার-প্রচারণায় প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে বাতিল হতে পারে প্রার্থিতা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বিলবোর্ড বিষয়ে ইসি বলেছে, প্রচারণায় বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর প্রচারে বিলবোর্ডের ব্যবহার অতীতে ছিল না, এবার যুক্ত করা হয়েছে। পোস্টার ব্যবহার বন্ধে সংস্কার কমিশনেরও একটা প্রস্তাব ছিল। আর ব্যানার ও ফেস্টুনের ব্যবহার নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না। প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রচারসামগ্রীতে পলিথিন, রেকসিনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে। প্রচারণার সময় থাকছে তিন সপ্তাহ। আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও নেবে ইসি।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) প্রায় সব দলের প্রার্থীরাই আচরণ বিধিমালা ভাঙছেন।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনে ‘বাড়াবাড়ি’ আছে কি না, জানতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র : জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কারও পক্ষ থেকে নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে কোনো ‘বাড়াবাড়ি’ বা হয়রানির খবর আছে কি না, ইসি কাছে তা জানতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং তার দুজন প্রতিনিধি এই বৈঠকে অংশ নেন।

ইসি সচিব বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র জানতে চেয়েছিল, কোনো জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কারও কাছ থেকে বাড়াবাড়ির কোনো খবর আমরা পেয়েছি কি না। আমরা বলেছি, প্রাথমিকভাবে এসব অভিযোগ স্থানীয়ভাবেই নিষ্পত্তি হয়। আমাদের জানা মতে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমরা তার উত্তর দেব।’

তিনি জানান, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখিয়েছে। ইসি সচিব বলেন, ‘আমরা জানিয়েছি যে আমাদের কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সেল রয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকায় ইনকোয়ারি কমিটি, অ্যাডজুডিকেশন কমিটি এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা এসব বিষয় সমন্বয় করছেন এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।’ নির্বাচনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কেও যুক্তরাষ্ট্র জানতে চেয়েছে। ইসি সচিব বলেন, ‘আমরা জানিয়েছি, প্রায় সাড়ে ৯ লাখ নিরাপত্তাকর্মী বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করবেন।’

বৈঠকে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদলের বিশেষ কৌতূহল ছিল বলে জানান আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালটের প্রক্রিয়া, গণনা এবং সময়সীমা নিয়ে আমরা তাদের বিস্তারিত জানিয়েছি। নমুনা ব্যালট দেখে তারা বলেছেন, বিষয়টি জটিল ও কষ্টসাধ্য। তবে তারা আমাদের শুভকামনা জানিয়েছেন।’ ইসি সচিব জানান, এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। তবে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনায় তাদের পক্ষ থেকে স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা পরিস্থিতি দেখতে যাবেন।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রচার বা এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান কি জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন (সাবজুডিস)। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করার এখতিয়ার আমার নেই।’ ৩১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর মহিলা সমাবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার জানা নেই।

নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক, বাড়ছে হুমকি ধামকি : নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে একাধিক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও একে অপরকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। এরইমধ্যে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন প্রার্থী ও সমর্থককে জরিমানা করা হয়েছে।

অন্যদিকে এসব প্রতিহত না হলে প্রয়োজনে একযোগে সরে দাঁড়ানোর কথাও জানান একাধিক প্রার্থী। তাদের এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার রায়হান কবির বলেছেন, যেকোনো ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা নির্বাচন পরিবেশ নষ্ট করার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর আগে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গোলাম মসীহকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গত ১০ জানুয়ারি সোনারগাঁ পৌরসভা এলাকায় ধর্মীয় বিষয়ে তালিম দেওয়ার কথা বলে তিনি নারীদের মধ্যে নির্বাচনি প্রচারপত্র বিতরণ করেন। অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যতা পাওয়ায় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাইরুজ তাসনিম তাকে এ জরিমানা করেন।

এদিকে, গত সোমবা বিকেলে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালামের পোস্টার ব্যক্তিগত গাড়িতে লাগানোর দায়ে তার এক সমর্থককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তারিকুল ইসলাম।

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইলিয়াস মোল্লা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুর রহমানের কাছে দুটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। ইউএনও আসাদুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার তিনি পৃথক দুটি অভিযোগ দিয়েছেন। একটিতে আগের রাতে তার ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যটিতে গোপালদী পৌরসভার মোল্লারচর এলাকায় প্রচারণায় বাধা ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুটি অভিযোগই বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর বিরুদ্ধেও দুটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগ তদন্ত শেষে অনুসন্ধান কমিটি তাকে সতর্ক করেছে বলে জানান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম ফয়েজউদ্দিন, যিনি এ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে পোস্টারে একসঙ্গে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ ও তার নিজ দলের প্রতীক খেজুর গাছ ব্যবহার করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা হয়। গত রোববার আরেকটি অভিযোগ জমা পড়ে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে- তিনি ধর্মীয় সভায় গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি তদন্তের জন্য অনুসন্ধান কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

ফতুল্লার পঞ্চবটি মোড়ে এনসিপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনি ক্যাম্প সড়কের উপর স্থাপনের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সরেজমিনে পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা পেলে উভয় প্রার্থীর প্রতিনিধিকে ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। এদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালামের সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় বাধা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে লিখিত আবেদন করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের নির্বাচনি এজেন্ট ও তার স্ত্রী নার্গিস আক্তার। অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. রাকিবুজ্জামান রেনু জানান, গত ২৩ জানুয়ারি এ অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।