নতুন যাত্রা, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জের পাহাড়
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৩ | অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায়ের শুরুতেই প্রত্যাশা আর চ্যালেঞ্জের পাহাড় সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আয়োজিত শপথ অনুষ্ঠানে সংবিধান অনুযায়ী নবনির্বাচিত এমপিরা শপথ নেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। নির্বাচনি প্রক্রিয়া শেষে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, এর মধ্যে রয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। একইসঙ্গে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক আজ : শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়েছে। সদ্য গঠিত মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক আজ বুধবার বিকাল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে দেওয়া বার্তায় গতকাল সন্ধ্যায় বিষয়টি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, নতুন সরকার গঠনের পর বুধবার সচিবালয়ে অফিস করবেন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম কার্যদিবসে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক এবং সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময়সভা করবেন তিনি। এ ছাড়া বুধবার সকাল ১০টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে ফিরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তিনি অফিস করবেন। সেখানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময়সভায় অংশ নেবেন। সভা শেষে সচিবালয়ে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে বিকাল ৩টায় মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ বৈঠক করবেন। মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শেষে বিকাল ৪টায় সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান, ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এই শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তার নেতৃত্বে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমান এবং তার নতুন মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করান। প্রথমে তিনি বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান। এরপর পর্যায়ক্রমে বিকেল ৪টা ১৮ মিনিটে মন্ত্রী ও পরে ৪টা ২৬ মিনিটে প্রতিমন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
শপথ গ্রহণকারী মন্ত্রীরা হলেন- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু), মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ড. খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম ও শেখ রবিউল আলম।
প্রতিমন্ত্রীরা হলেন- এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ব্যরিস্টার কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলাম, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক নুর, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য ভেঙে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, চীন, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটানসহ ১৩টি দেশের বিশ্বনেতাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নয়াদিল্লির প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ সংসদ কমপ্লেক্সের জমকালো দক্ষিণ প্লাজায় উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, সিনিয়র সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমান এবং তাদের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সাদা জামা ও কোট-প্যান্ট পরিহিত তারেক রহমানকে এ সময় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। প্রায় ১ হাজার ২০০ আমন্ত্রিত অতিথিতে উপচে পড়েছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সরকার প্রধান হিসেবে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও তাদের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিকেল ৩টা ৫৮ মিনিটে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলে তাকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। এর কয়েক মিনিট পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিকাল ৪টা ৪ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন।
