শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই প্রধান অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, নির্বাচনে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা দেননি, কিংবা যারা কাউকেই ভোট দেননি–এই সরকারের কাছে তাদের সবার ‘সমান অধিকার’ থাকবে।
তিনি বলেছেন, “বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দলমত ধর্ম দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে, এই রাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশি হিসেবে, আপনার আমার আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান।”
শপথ নেওয়ার পর বুধবার প্রথম কর্মদিবসের কর্মসূচি সেরে রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই ভাষণ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে তারেক রহমান তার সরকারের কয়েকটি অগ্রাধিকার জানিয়ে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বার্তাও দেন।
তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।”
বিএনপি সরকার কীভাবে দেশ চালাতে চায়, সেই বার্তা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোর জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।”
সারাদেশে জুয়া এবং মাদকের বিস্তারকেও বর্তমান সরকার ‘আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ’ বলে চিহ্নিত করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সে কারণে জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সবরকমের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ‘সর্বোচ্চ উদ্যোগ’ গ্রহণ করছে।
‘রমজান যেন মুনাফার মাস না হয়’
বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে মুসলমানদের সংযমের মাস রমজান। সেজন্য দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “রামাদ্বান আত্মশুদ্ধির মাস। আমরা যদি আত্মশুদ্ধি শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করি তাহলে এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। যদিও আমাদের অনেকের মধ্যেই এই মাসটিকে ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়।”
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই মাসটিকে আপনারা ব্যাবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়–এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা সতর্ক থাকবেন।
“হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে, রাষ্ট্র এবং সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সকলক্ষেত্রেই অনাচার অনিয়মের সকল সিন্ডিকেটে ভেঙে দিতে বদ্ধ পরিকর।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছোট-বড় সকল ব্যবসায়ীর পাশাপাশি ক্রেতার স্বার্থ রক্ষা করেই সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়।
সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ নিলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে, সে ব্যাপারে যে কোনো পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার ‘প্রস্তুত’ থাকবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
গ্যাস-বিদ্যুতে কৃচ্ছ্রতার বার্তা
তারেক রহমান বলেন, রোজার মাসে মানুষ ইফতার, তারাবিহ ও সেহরির সময়গুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চায়। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
“অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রতা সাধন প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। অফিস আদালতে বিনা প্রয়োজনে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস বিদ্যুৎ পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদাতের অংশ বলেই আমি মনে করি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে কৃচ্ছ্রতা সাধনের আহ্বান জানানোর আগে সরকারের মন্ত্রী এবং বিএনপির এমপিদেরকে দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছেন তিনি। সেজন্যই বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না।
“আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবীর 'ন্যায়পরায়নতার' আদর্শ অনুসরণ করবে। আমি মনে করি, বিএনপির সংসদীয় দলের এইসব সিদ্ধান্ত 'ন্যায়পরায়নতার' আদর্শেরই প্রতিফলন।”
যানজট নিয়ে পরিকল্পনা
রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর বড় সমস্যা যানজট নিয়ন্ত্রণে সরকারের কী ভাবনা, সে কথাও তারেক রহমান বলেন।
“রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ তার নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসা বাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে সঠিক সময়ে অফিস আদালত ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
“এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল নৌ সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ সুলভ এবং নিরাপদ করা করা গেলে একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে অপরদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।”
কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার
সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার কথাও বলেন।
“আমরা নিজেদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ব বাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তথ্য প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং স্বচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে।
“দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধায় জ্ঞানে বিজ্ঞানে নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যতরকমের সহযোগিতা দেয়া যায়, সবরকমের সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।”
‘প্ল্যান বাস্তবায়ন শুরু’
যুক্তরাজ্যে দেড় যুগের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছিলেন, “আই হ্যাভ আ প্ল্যান।” ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেন।
সে প্রসঙ্গ ধরে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, দেশের জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছে। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের।
“আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ । অঙ্গীকার পূরণের এই যাত্রাপথে আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।”
‘সবার জন্য নিরাপদ ভূমি’
তারেক রহমান তার ভাষণের শুরুতেই বলেন, “হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পেরেছি। তাবেদার মুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
“দেশে গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই যাত্রালগ্নে আমি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের কারণেই দেশে আবার মানুষের অধিকার সম্মান এবং মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বার্তা দিতে চাই, মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান তথা দলমত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এই দেশকে আমরা একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।”
