যাত্রী কল্যাণ সমিতি
জানুয়ারিতে ৫৫২ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫৪৬, আহত ১২০৪
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪৬ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২০৪ জন—এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সময়ে রেলপথে ৩৭টি দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হন। নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু, ৬ জন আহত এবং ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৫৯৭টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৬ জনে; আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ জন।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবর মনিটরিং করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে সংগঠনের দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেশি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২০৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২২৩ জন নিহত ও ১৩২ জন আহত হয়েছেন। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৮৬ শতাংশ, মোট নিহতের ৪০.৮৪ শতাংশ এবং আহতের ১০.৯৬ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক চিত্র
সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগ–এ। এখানে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ৩২৮ জন আহত হয়েছেন। আর সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগ–এ; ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৬৩ জন আহত হয়েছেন।
হতাহতদের পরিচয়
সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১৩১ জন চালক, ৮৯ জন পথচারী, ৫৩ জন পরিবহন শ্রমিক, ৭৯ জন শিক্ষার্থী, ৯ জন শিক্ষক, ৬২ জন নারী, ৬৭ জন শিশু, ৪ জন চিকিৎসক, ৪ জন সাংবাদিক, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ১১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।
নিহতদের মধ্যে আছেন—২ জন পুলিশ সদস্য, ২ জন সেনা সদস্য, ১ জন নৌবাহিনীর সদস্য, ৪ জন চিকিৎসক, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১২৭ জন চালক, ৮৯ জন পথচারী, ৫৪ জন নারী, ৪৮ জন শিশু, ৫৭ জন শিক্ষার্থী, ২১ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮ জন শিক্ষক এবং ১১ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী।
যানবাহন ও দুর্ঘটনার ধরন
এ সময়ে ৮২৯টি দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮.৪৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৩.৬৪ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-লরি, ১৪.৩৫ শতাংশ বাস, ১৩.৬৩ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ৫.৫৪ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ৯.০৪ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর-লেগুনা এবং ৫.৩০ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৮.৩৬ শতাংশ গাড়িচাপা, ২৮.৬২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬.৮৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৫.৬১ শতাংশ অন্যান্য কারণে, ০.১৮ শতাংশ ওড়না চাকার সঙ্গে পেঁচিয়ে এবং ০.৩৬ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষে ঘটেছে।
সড়কের ধরনভিত্তিক বিশ্লেষণ
মোট দুর্ঘটনার ৪২.৫৭ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৭.৮৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২৪.০৯ শতাংশ ফিডার রোডে ঘটেছে। এছাড়া ৪.৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, ০.৫৪ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ০.৩৬ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে, জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ :
১. সড়ক পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় নীতি ও কৌশলগত দুর্বলতা।
২. সারাদেশে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল।
৩. সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিক্সা, নসিমন-করিমন অবাধে চলাচল।
৪. জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা।
৫. সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় অন্ধবাঁেকর সৃষ্টি।
৬. মহাসড়কের নির্মাণ ক্রটি, যানবাহনের ক্রটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।
৭. উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।
৮. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন।
৯. বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।
দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ :
১. সড়ক পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় উন্নত বিশ্বের নীতি ও কৌশল অনুসরন করা।
২. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহন, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান।
৩. সিসি ক্যামরা পদ্ধতিতে ট্রাফিক আইনের প্রসিকিউশন পদ্ধতি চালু করা।
৪. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা।
৫. সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা।
৬. মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা।
৭. সড়ক পরিবহন আইন উন্নত বিশ্বের আদলে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রয়োগ করা।
৮. সারাদেশে উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওর্য়াক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৯. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা।
১০. মেয়াদোর্ত্তীন গণপরিবহন ও দীর্ঘদিন যাবত ফিটনেসহীন যানবাহন স্ক্যাপ করার উদ্যোগ নেওয়া।
১২. ড্রাইভিং প্রশিক্ষন গ্রহনকারী চালকের উপর চাপিয়ে দেওয়া ভ্যাট ও আয়কর অব্যাহতি দিতে হবে।
১৩. মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা আমদানী ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করা ।
১৪. সড়ক পরিবহন সেক্টরের পরিচালনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ লোকজনদের সমন্ময়ে একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা।
