কক্সবাজারে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি, নিহত ২২
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী, পেকুয়া ও রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধসও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত চার দিনে এসব দুর্যোগে জেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে হাজারো বসতবাড়ি, কৃষিজমি, সবজিক্ষেত ও চিংড়ির ঘের। সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় অনেক এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা (ডবলতলী) এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় দুই শিশু। তারা সম্পর্কে চাচাতো-জেঠাতো ভাইবোন। নিহতরা হলো বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার (১৫) এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, বন্যা ও পাহাড়ধস—দুই দুর্যোগ একসঙ্গে আঘাত হানায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, কয়েক দিন ধরে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে ডুবে আছে, এর মধ্যেই দুই শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
চকরিয়ার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে রয়েছে। নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে পেকুয়ার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়ির ঘের ডুবে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
মাতামুহুরী ও পেকুয়ার কয়েকটি বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। বিশেষ করে কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।
রামুতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল ও জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রধান সড়ক ও অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
কচ্ছপিয়া এলাকার বাসিন্দা সাদেক মাহমুদ সিমরান বলেন, হাজার হাজার মানুষ জলাবদ্ধতায় আটকে পড়েছেন। বাড়িঘর ও সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষ বাইরে বের হতে পারছেন না। বাজার বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে উঠেছে।
চকরিয়ার বাসিন্দা করিম উল্লাহ জানান, টানা পাঁচ দিন সূর্যের দেখা নেই। বৃষ্টি কিছুটা কমলেই পানি নামবে বলে মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভারী বর্ষণ শুরু হচ্ছে। এতে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
সাহারবিলের কৃষক মনির আহমেদ বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
অটোরিকশাচালক মুজিবুর রহমান জানান, টানা বৃষ্টির কারণে যাত্রীসংখ্যা কমে গেছে। সারাদিন গাড়ি চালিয়েও সংসার চালানোর মতো আয় হচ্ছে না।
চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেন, পাহাড়ি ঢলের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। অধিকাংশ পরিবার রান্না করতে না পেরে শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে।
মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। কোনাখালী ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ইউএনও শাহীদ দেলোয়ার বলেন, নদীর পানি বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পরিমাপ অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা উভয় নদীর বিপৎসীমার চেয়ে বেশি। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। শুধু কোনাখালী এলাকায় একটি বেড়িবাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থেকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে হাজারো যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সময়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলার সামগ্রিক দুর্যোগ পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও উদ্বেগজনক।
